অনিক-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

কেন আমি হেফাজতে ইসলামের বিরোধিতা করছি ?

লিখেছেন: অনিক

মানুষ কতটা ধর্মভীরু তার প্রমাণ পাচ্ছি আশে পাশের চেনা জানা মানুষ গুলোকে দেখেই।হেফাজতে ইসলাম যখনি ‘ইসলাম রক্ষার আন্দোলন’ বলে ট্যাগ দিল নিজেদের আন্দোলনকে, এদেশের ধর্মান্ধ মানুষ তার সকল বিশ্বাস নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো তাদের সাথে সারা দিতে( ব্যতিক্রম কয়েকজন বাদে ) ।
তারা একটি বার চিন্তাই করল না,আসলেই কি এটি ইসলাম রক্ষার আন্দোলন?
শুধু মাত্র ধর্মের নাম ব্যবহার করাই সকল নীতি বিসর্জন দিয়ে তারা গলাই গলা মিলিয়ে হেফাজতে জামাতের ১৩ দফা দাবি লুফে নিল।

সকল কেই এই লিখা টা পরার অনুরোধ করছি,

কেন আমি হেফাজতে ইসলামের বিরোধিতা করছি ?

লিখেছেনঃ মুক্তার ইবনে রফিক

আমি একজন সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আমার জন্ম মদিনায়। আমার জন্মের পর ৭ টি বছর আমি কাটিয়েছি এই পুণ্যভূমিতে। এখনও আমার জমজম কূপের সেই শীতল পানি খাওয়ার কথা মনে পড়ে, সাফা মারওয়ায় দৌড়ানোর কথা মনে পড়ে, আব্বুর সাথে হেরেম শরিফে নামাজ পড়ার কথা মনে পড়ে, চার বছর বয়সেই কুরআন শরীফ পড়ার কথা মনে পড়ে। মাঝে নামাজে অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলাম, তবে আল্লাহ্‌র রহমতে সম্প্রতি আবারও নিয়মিত নামাজ পড়ছি। আমি নিজেকে মুমিন বান্দা সার্টিফাইড করার জন্য এগুলো বলছিনা, আমি কাফির না মুমিন তা নির্ধারণ করবেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা।

যাই হোক, এই মুহূর্তে হেফাজতে ইসলাম হচ্ছে টক অফ দ্যা কান্ট্রি। দেশব্যাপী বিরাজ করছে চরম উত্কণ্ঠা। দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে—এ নিয়ে জনমনে শঙ্কার পাশাপাশি চলছে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা-সমালোচনা। একজন মুসলমান হয়েও কেন আমি হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির বিপক্ষে তা ক্লিয়ার করতে চাচ্ছি।

প্রসঙ্গঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং হেফাজতে ইসলাম

ইসলামের দৃষ্টিতে কিন্তু মাফ নেই যুদ্ধাপরাধীদের। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদার ৪৫ নং আয়াতে এবং সূরা বাক্বারা আয়াত নম্বর ১৭৮, ১৭৯ থেকে জানা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত না ক্ষতিগ্রস্থের পরিবার অপরাধকারীকে ক্ষমা না করে ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাধীর গুনাহ মাফ হচ্ছে না এবং অপরাধীর বিচার করতে হবে ক্ষতিগ্রস্হদের উপর কৃত অপরাধের ভিত্তিতেই। আর যারা এই বিচার মানবে না তারা গণ্য হবে জালিম হিসেবে।

কিন্তু দেখুন, ১৫ই মার্চ চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ থেকে যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবি উঠেছে। খোলসের উন্মোচন হয়ে গেছে তখনই, তাই নয় কি ?

তারা যদি সত্যিকারার্থে ইসলামের সেভিওর হয়ে থাকতেন, তাহলে তাদেরকে জামায়াতে ইসলামের ব্যাপারে তারা কঠোর হতেন। যিনি মনেপ্রাণে মুসলিম, তিনি কখনই জামায়াত শিবিরকে সাপোর্ট করতে পারেন না। জামায়াত শিবিরের মত উগ্র ধর্মান্ধ দলই পারে ধর্মের অপব্যবহার করতে, ধর্মকে পুঁজি করে ক্ষমতা আরোহণের নির্লজ্জ চেষ্টায় নিমজ্জিত হতে। হাতের রগ কাটা, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট থেকে এমন কোন লোমহর্ষক কাজ নেই যা তারা করেনি। ৭১ এ এমন কাজ তারা করেছে, যা কোনভাবেই ইসলামপন্থী হতে পারেনা।

কিন্তু কই কোথাও তো হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতে ইসলামের বিপক্ষে কিছু বলতে দেখলাম না। তাহলে কি ধরে নিব আমরা ?

প্রসঙ্গঃ তাদের ১৩ দফা দাবীর মাঝে ৩টি দাবীর ব্যাপারে আমার বক্তব্য।

১) মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা।
আমার বক্তব্য – কোনটি মূর্তি আর কোনটা ভাস্কর্য সেটা আগে বুঝতে হবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের দেব-দেবীর মূর্তির পূজো করেন। কিন্তু অপরাজেয় বাঙলা’র মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী ভাস্কর্যকে আমরা পূজো করিনা। এগুলো আমাদের দেশের সম্পদ, আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। এগুলো ধ্বংস করতে চায় হেফাজত- কিসের ভিত্তিতে, কোন যুক্তিতে ? তাহলে সৌদি আরবে অবস্থিত উটের ‘মূর্তি’; ইসলামি রাষ্ট্র ইরানে অবস্থিত কবি শেখ সাদি, কবি ওমর খৈয়াম ও মহাকবি ফেরদৌসির ‘মূর্তি’ নিয়ে তারা কিছু বলে না কেন ?!?

২) ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।

আমার বক্তব্য- তাহলে পরনারীর সাথে টেলিসঙ্গমকারী আল্লামা হজরত দেলোয়ার হোসেন সাইদির বিচার দাবী করেন না কেন হেফাজতে ইসলাম ? কাশিমপুর কারাগারে কয়েদি-নিপীড়ক সমকামী সাকা চৌধুরীকে পাথর নিক্ষেপ অথবা দোররা মারার কথা বলেনা কেন হেফাজতে ইসলাম ? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ লিঙ্গ নিরপেক্ষভাবে নারী পুরুষ সবাইকে সমান নাগরিক অধিকার দিতে বাধ্য। এদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের একটা বড় অংশই নারী, যারা পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে এদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করছে। হেফাজতের দাবি মেনে নিলে তাদের ঘরে ফিরে যেতে হবে। হেফাজতের দাবি মেনে নিলে এদেশের নারীরা রাজনীতি করার অধিকার হাড়াবে। খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, মতিয়া চৌধুরি, পাপিয়া এরা রাজনীতি করতে পারবেন না। আর বিজাতীয় সংস্কৃতি ? তাহলে তো বাংলাদেশ থেকে মার্কিন নাস্তিক মার্ক জুকারবার্গের উদ্ভাবিত ফেসবুক নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বাংলাদেশের যারা যারা নাস্তিক জুকারবার্গের ফেসবুক ব্যবহার করে, তাদেরও বিচার করতে হবে। কোনটা বিজাতীয় সংস্কৃতি তা হেফাজতি নেতারা সঠিক ভাবে জানেন কি?আরব দেশের পোশাক ,খাবার,সংস্কৃতি কিভাবে বাঙ্গালির জাতীয় সংস্কৃতি হবে তার উত্তর তারা কিভাবে দিবেন??এই উত্তর দিতে গেলেই তারা তাদের ধর্ম বিশ্বাস এর অবতারনা করবেন !

৩) কথিত শাহবাগি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা।

আমার বক্তব্য- শাহবাগে আস্তিক, নাস্তিক, হিন্দু, মুসলমান সকলেই এসেছিলেন। ঠিক যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশগ্রহণ করেছিলেন সকল ধর্মের অনুসারীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। যার যার ধর্ম তার তার; কিন্তু রাষ্ট্র সকলের। আবার যারা ব্লগার সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখেন না, তারা ব্লগার রাজীবকেই শাহবাগ আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করছেন, কিন্তু এই অথর্ব দাবীর সাথে আমরা একমত নই। শুরুর দিকে শাহবাগে সমন্বয়হীনতার কারণে নানা সমস্যা হলেও, পরবর্তীতে কিন্তু ঠিকই আযানের সময় মাইক বন্ধ করে রাখা হত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের প্রত্যেকটিতে। প্রতিটি সমাবেশেও কিন্তু ঠিক তাই করা হয়েছে। কিন্তু সেদিনও সুমিষ্ট ভাষায় গোলাপি বেগম বক্তৃতা দিয়েই চলেছিলেন আযানের সময়, কই হেফাজতে ইসলাম তো এই নিয়ে কিছু বলেনা !! একজন মুসলমান হিসেবে আমি চাই আমার নবীকে নিয়ে যে কুৎসা রটনা করবে তার সর্বোচ্চ বিচার হউক। কিন্তু আমি এটাও বিশ্বাস করি, কি বোর্ডের জবাব হবে কিবোর্ডের মাধ্যমে, যুক্তির জবাব যুক্তিতে, আবেগের জবাব আবেগে। আমার ধর্মবিশ্বাস এতটা ঠুনকো না যে কেউ কিছু বললেই আমার ধর্মবিশ্বাস টলে যাবে।

প্রসঙ্গঃ লং মার্চ নিয়ে ভ্রান্ত আকিদা

লং মার্চ নাস্তিকদের কর্মসুচি কিনা এই প্রশ্নের জবাবে ইসলামের হেফাজতকারী আল্লামা শফী বলেন-” হযরত মুহাম্মদ (সা।)মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত লং মার্চ করেছিলেন। ” নাউজিবুল্লাহ…

হিজরত শব্দের অর্থ-— দেশান্তর বা মাতৃভূমি ত্যাগ। উল্লেখ্য বিধর্মীদের অত্যাচারের কারণে মুসলমানরা ধীরে ধীরে মক্কা থেকে মদিনায় চলে যান। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহ’র নির্দেশ আসার পর, তিনি হজরত আলী-কে ডেকে, তাঁরে শয্যার উপর চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে নির্দেশ দেন এবং রাতের অন্ধকারে হজরত আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন।

লং মার্চের প্রবর্তক নাস্তিক কমিউনিস্ট মাও সে তুং। হিজরতের সাথে মাও সে তুং এর লং মার্চ তুলনা করে ঈমাম শাফি আপনি নিজেই ইসলাম ধর্মানুসারী কয়েক কোটি মানুষের ধর্মানুভূতি তে আঘাত হানলেন। আপনি কিভাবে ইসলামের হেফাজাত এর দায়িত্ব নিলেন !

তারা বলছেন পৃথিবীর প্রথম লংমার্চ পরিচালিত হয় মহানবী (স.)-এর নেতৃত্বে। তারা বলছেন লং মার্চ মানে দীর্ঘ যাত্রা। তাহলে হযরত মুসা (আঃ) তার পুরা কওম নিয়ে যে নীল নদ পারি দিলেন সেই যাত্রা কে কি বলা হবে ? সেটা ও ত দীর্ঘ যাত্রা ছিল । তাই নয় কি ?

প্রসঙ্গঃ ব্লগার নিয়ে ভ্রান্তি
এরা জানে না, ব্লগ কি?? এরা জানে না ব্লগের বানান কিভাবে লিখতে হয়। এরা এদের নেতাদের দ্বারা ভুল পথে পরিচালিত হয়ে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদ্রাসার ছাত্র ভাইয়েরা, আপনারা আগে জানুন, বুঝুন, তারপর আন্দোলনে নামুন। সতর্ক থাকুন আপনাদেরকে যেন কেউ ব্যবহার না করতে পারে।

প্রসঙ্গঃ মুসলমানের সার্টিফিকেট

৭১ এ উলঙ্গ করে বাঙ্গালীর লিঙ্গ পরীক্ষা করে দেখতো পাকি হায়েনা; খৎনা থাকলেই মুসলমান, নাইলেই “বিধর্মী” অপবাদে গরম গরম ব্রাশফায়ার ! বর্তমান অবস্থা কিন্তু অনেকটা এইরকমই। কাউকে মুনাফিক, কাফির কিংবা নাস্তিক বলার এখতিয়ার হেফাজতে ইসলাম রাখে না। কে মুমিন আর কে কাফির তা নির্ধারণ করবেন স্বয়ং আলাহ তায়ালা। এভাবে তারাই তো ইসলামে ধর্মের অবমাননা করছেন, কিন্তু এই নিয়ে প্রশ্ন তোলার কেউ নেই ! আফসুস…

প্রসঙ্গঃ মহিলা সাংবাদিক মারধর

আমার বক্তব্যঃ একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক নাদিয়া শারমিন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের খবর সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে প্রশ্ন তুলে বলা হয়, ‘পুরুষের সমাবেশে নারী সাংবাদিক কেন?’ এ নিয়ে নাদিয়ার সঙ্গে সমাবেশকারীদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে নাদিয়া শারমিনকে প্রচণ্ড মারধর করতে করতে সমাবেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়।

—– হেফাজতে ইসলাম, আপনারা মাঠে নেমেছেন ইসলামের সেভিওর হিসেবে, তাই না ?? ইসলামে নারীদের সন্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার কথা বারবার বলা হয়েছে। এই আপনাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার নমুনা ?!?

আমার কিছু কথাঃ

একজন নাস্তিক যখন কোন ধর্মকে মানেনা, সেটা আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে খুব নিকৃষ্টভাবে আক্রমণই যখন একজন নাস্তিকের কাজ হয়, তখন তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত। ইটজ ভেরি সিম্পল। উগ্র ধর্মবিদ্বেষী আর সাম্প্রদায়িকতার মাঝে কোন পার্থক্য নেই।

সরকারের কাছে আমার দাবী,
১) উগ্র নাস্তিকদের আইনের আওতায় আনুন, কোন চুনোপুঁটিকে ধরবেন না প্লিজ।
২) উগ্র ধর্মান্ধদেরও আইনের আওতায় আনুন।
৩) ব্লগার মানেই যে নাস্তিক নাহ, তা ক্লেয়ারিফাই করুন বিবৃতি দিয়ে।

উগ্র নাস্তিক এবং উগ্র ধর্মান্ধ > আই হেট বোথ দ্যা ক্লাসেস…!!

পরিশেষঃ

আমরা সাধারন মুসলমানরা বিশ্বাস করি আল্লাহর সেই বাণীতে, যেই বাণী বলে একজন মানুষকে হত্যা করা চরম অপরাধ। সে ধার্মিক হোক আর বিধর্মীই হোক। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় সকল ধর্মের উপর, সকল মতের উপর শ্রদ্ধাশীল হতে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) বিদায় হজের ভাষণে বলে গিয়েছিলেন, “তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করোনা।”

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/anik/10550.html



মন্তব্য করুন