মুক্তিকামী-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

নতুন প্রজন্মের ইতিহাস হবে ঐক্য, সম্মান ও স্বীকৃতির ইতিহাস

লিখেছেন: মুক্তিকামী

যে কোন আন্দোলন যখন চলমান কিংবা সফলতার মুখ দেখে তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। আমাদের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। জাতিগত ভাবে অন্যায় কে আমরা সেই অর্থে কখনো মেনে নিতে পারি নি। নিজেদের ভাষা নিয়ে যখন পশ্চিমা শাসক গুষ্ঠি অন্যায় আচরণ শুরু করে, তখন আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। প্রতিবাদ করেছি সকল প্রকার শোষণ, নিপীড়ন ও অসমাতার বিরুদ্ধে। আর এই প্রতিবাদের ভাষা কখনো আমরা এঁকে দিয়েছি মিছিল, মিটিংয়ের মাধ্যমে কখনো বা সশস্ত্র সংরামের মাধ্যমে। আর এই সব সংগ্রামের মাধ্যমেই রচিত হয়েছে আমাদের অন্যায়ের প্রতি প্রতিবাদের ইতিহাস।

এই সব আন্দোলন গুলো চলার সময় এবং চুরান্ত সাফল্য পাওয়ার জন্য আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় যেমন দিতে হয়েছে তেমনি দিতে হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। তবুও প্রতিবাদ কিন্তু থেমে থাকেনি। যেখানে কোন অসামঞ্জস্য কিংবা অন্যায় হয়েছে সেখানেই এই জাতি প্রতিবাদ করেছে।

আমাদের প্রতিবাদের এই যে একটি ঐতিহ্য রয়েছে তাঁর সর্বশেষ সংস্করণ হচ্ছে এ বছর ৫ ফেব্রুয়ারি যখন মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা হয়। ফাঁসির রায় না হওয়া এবং এর পর ওই আসামির ‘ভি’ চিহ্নিত প্রতীক গণমাধ্যমে দেখে এই দেশের তরুন সমাজ ঘরে বসে থাকতে পারেনি। তাঁদের মনে হয়েছে এই রায় ওই কুখ্যাত আসামির জন্য যথেষ্ট নয়। আর যদি যথেষ্টই হবে তাহলে আসামী কেন ভিক্টরি সাইন সকলকে দেখাবে? অর্থাৎ ওই আসামী নিজেকে বিজয়ী মনে করেছিলো। যা এই দেশের বর্তমান প্রজন্ম মেনে নিতে পারেনি।

তৈরি হয় আমাদের প্রতিবাদের আরেকটি অধ্যায়। এই প্রতিবাদ প্রথম রচিত হয়েছিলো এই দেশের তরুন প্রজন্মের দ্বারা। এর পরের সকল অধ্যায় রচিত হয়েছে এই দেশের আপামর জনগনের দ্বারা। তো, এই যে প্রতিবাদ টি শুরু হয়েছিলো ৫ ফেব্রুয়েরি, সেটি কিন্তু এখনো চলমান। শুরুতেই বলেছি যেকোনো প্রতিবাদ যখন চলমান থাকে, এটিকে চালিয়ে নিতে এবং সাফল্ল্যের দিকে ধাবিত করতে রয়েছে অনেকের ত্যাগ এবং নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণ। আবার একই সাথে রয়েছে নানা রকম প্রোপাগান্ডা বা অভিযোগ।

এই লেখার মূল বিষয় হচ্ছে একটি আন্দোলন যখন চলতে থাকে তখন অনেক জন কেই অনেক রকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আবার অনেক কে অনেক রকম হয়রানির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এর মাঝে হয়তো কিছু কিছু ত্যাগ বা হয়রানির কথা আমরা পত্র পত্রিকা বা অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে জানতে পারি। আর অনেক  ত্যাগের কথা হয়তো আমাদের আর জানা হয়ে উঠে না। যে কোন আন্দোলনের ক্ষেত্রেই আসলে এটি হয়। অনেক বড় পরিসরে যদি একটি আন্দোলন হয় সেখানে সবার সব কিছু আপনি জানবেন এটি আসলে আশা করা ঠিকও নয়।

যে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ ৫ ফেব্রুয়ারির পর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচার সহ ৬ দফা দাবী আদায়ের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে, সেখানে অনেক তরুন রয়েছে যারা সরাসরি রাজপথে সরিক হয়েছে আবার এমন অনেকেই রয়েছেন যারা নানা মুখী ব্যস্ততা কিংবা অন্যান্য ঝামেলায় হয়তো সব সময় রাজপথে থাকতে পারেননি কিন্তু লেখা লেখির মাধ্যমে কিংবা ইন্টারনেট সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ করে গিয়েছেন। এছাড়া আরও অনেক ভাবেই যে যেভাবে পেরেছেন হয়তো এই আন্দোলনের সাথে সরিক হয়েছেন। আর সত্যি কথা বলতে কি এটি তো সাধারন মানুষের আন্দোলন। তাই অনেকেই অনেক ভাবে এই আন্দোলনের সাথে যেমন সম্পৃক্ত হয়েছেন তেমনি করেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ।

এই সকল প্রতিবাদি মানুষ গুলোর অনেকেই হয়তো এর আগে নাতো রাজপথে নেমে এসেছে নাতো তাঁদের লেখনি তে এইভাবে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু সময়ের প্রয়জনে সকলেই হয়েছে প্রতিবাদি।  এই প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক কে হয়তো নানান রকম মাশুল দিতে হয়েছে বা হচ্ছে। হয়তো যাদের অনেকের ত্যাগের কথা আমরা সবাই জানি, সেটি নিয়ে তো লেখার কিছু নেই। তবে এমন অনেকেই রয়েছে যারা নানা ভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন বা করছেন নানা ভাবে যা আমরা হয়তো সবাই জানি না।

প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ গুলোর প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ হুমকি তো রয়েছেই, তবে সেটি আমরা সবাই জানি এবং এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর চরিত্র এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত। এর বাহিরে এমন অনেকেই রয়েছে যারা ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়েছেন গত ৫ ফেব্রুয়ারির পর যার এক দুটি হয়তো বলা যেতে পারে। আর এই বিষয়টি কেন অবতারণা করলাম সেটি ব্যাখ্যা করবো লেখার শেষ অংশে।

৫ ফেব্রুয়ারির পর অনেকেই হয়তো রয়েছেন যাদের হয় চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছে নয়তো চাকরিটি চলে গেছে। আবার অনেকেই রয়েছেন যারা চাকরি করে যাচ্ছেন তবে হয়তবা প্রাইভেট চাকরি করার কারনে অফিসের বসের কাছে অনেক কিছু শুনতে হচ্ছে এই বলে যে ‘এই সব ঝালেমায় জরানোর কি দরকার? অফিসের কোন ক্ষতি হতে পারে। আর এই সব ঝামেলায় জরাবে না’। এছাড়া আরও অনেক উদাহরন রয়েছে। উদাহরনের সংখ্যা না বারিয়ে যে বিষয়টি বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে এরা প্রত্যেকেই ত্যাগ স্বীকার করেই আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে এবং এদের অনেকের কথা হয়তো আমরা জানি না। যেহেতু একটা আন্দোলনকে সাফল্য মণ্ডিত করতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়, তাই এরা এটি মাথা পেতে নিয়েছেন। তবে এদের এই ত্যাগ কে কিন্তু সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর কিন্তু আজও আমরা শুনি কোন একজন মুক্তিযোদ্ধা জীবন যুদ্ধে হেরে গেছেন কিংবা উনি যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সেটি ই কেও জানে না। এই রকম আরও অনেক খবরই আমরা শুনতে পাই। গণজাগরণ মঞ্চকে একটা সময় বলে হয়েছে নতুন একটি মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সেই রকম কিছু। এই আন্দোলনটি প্রাথমিক সাফল্য আমরা দেখেছি কাদের মোল্লার আপিলের মামলার রায়ের মাধ্যমে। হয়তো একটা সময় এই আন্দোলনটি সফল হবে। তখন যেন এই যোদ্ধাদের আমরা ভুলে না যাই।

একটি লড়াইয়ে অনেকগুলো পক্ষ তৈরি হয়, থাকবে ভিন্ন মত। সব পক্ষের সব কাজের দায়ভার যেমন কারো পক্ষে নেওয়া সম্ভব না ঠিক তেমনি সকল পক্ষের মতামত ও তাঁদের অবদান কে স্বীকার করতে হবে। ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে “হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ”। আমাদের “অন্যায়ের প্রতিবাদের” ইতিহাস টি ঘুরে ফিরে আসুক। আর ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে পতিত হোক বিভাজন ও অস্বীকৃতির ইতিহাস। নতুন প্রজন্মের ইতিহাস হবে ঐক্য, সম্মান ও স্বীকৃতির ইতিহাস। আর এই ইতিহাস ফিরে ফিরে আসবে আমাদের অনাগত দিনগুলোতে।

ফেইসবুক আইডি- https://www.facebook.com/aminul1

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/amin1000/25431.html



মন্তব্য করুন