আমি বেয়াদব-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

‘চেতনা’র তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমাদের বর্তমান চেতনার অবস্থান

লিখেছেন: আমি বেয়াদব

মানুষ এক অতি উন্নতমানের অধিকতর চেতনাসম্পন্ন সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। চেতনা মানুষের এক মহামূল্যবান সম্পদ। এর কারণেই মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। চেতনা মানে না নির্দিষ্ট কোনো সীমা, এমনকি মানবরচিত আইনের গণ্ডি; মানে না যুক্তি, দেশ-সমাজ, ধর্ম-বর্ণ, উঁচু-নিচুর বিভক্তি। চেতনার গতি দ্রুত, বিচরণ সর্বত্র। পৃথিবীর অপর প্রান্তের বিপন্ন ‘মানুষদের’ জন্যে শুধু নয়, অপেক্ষাকৃত কম চেতনাসম্পন্ন প্রাণীদের কষ্টও সে সহ্য করতে পারে না। যদি সে মানুষ হয়; যদি তার মধ্যে ‘চেতনা’ নামের একটা অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক ও অদৃশ্য বস্তু অবশিষ্ট থাকে। কেননা কোনো কোনো সময় অধিক অপরাধকর্মের দ্বারা এই ইতিবাচক শক্তিটি পুরোপুরি নষ্টও হয়ে যেতে পারে। আবার মানুষের এই অতি মূল্যবান ও শ্রেষ্ঠ সম্পদ চেতনা ভুল শিক্ষা, ভুল ধর্ম-দর্শন বা অসুস্থ সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবে ভুল পথেও পরিচালিত হতে পারে। তখন সৃষ্টি হতে পারে চেতনার কৃত্রিম সংকট। সে সময় স্বাভাবিকভাবেই বিবেক লোপ পায়, মানবতা বিপন্ন হয়। সমাজ-রাষ্ট্রে দেখা দেয় নানামুখি সংঘাত, ভয়াবহ দাঙ্গা-হাঙ্গামা, যুদ্ধ-ফ্যাসাদ, মানবিক বিপর্যয়। কারণ বিবেক ও মানবতার উৎস এই চেতনা নামের শক্তি। তবে চেতনা যতই কৃত্রিম সংকটে পড়ুক অথবা ভুল পথে পরিচালিত হোক, সবসময়ই একে পুনর্জাগ্রত করার ও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার একটা শক্তি সৃষ্টিগতভাবেই মনের অবচেতন স্তরে অবশিষ্ট থাকে। অবশ্য অল্পকিছু মানুষের বেলায় এ পথটিও এক সময় রুদ্ধ হয়ে যায়।

বিবেক ও মানবতার সমন্বয়ে চেতনার যে সুস্থ ও সুনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ- এর নাম মনুষ্যত্ব। মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এই মনুষ্যত্ব। মনুষ্যত্বের বিকাশই প্রতিটি মানবজীবন সুস্থ সুন্দর ও আনন্দময় করে তোলে। যে আনন্দ নির্মল। যে আনন্দের আইনস্টানীয় প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু বিবেক-বিবেচনা বর্জিত, মানবতাবিবর্জিত অন্য যেকোনো কৃত্রিম আনন্দ ও ভোগ-বিলাসের সমান প্রতিক্রিয়া বর্তমান। যা একসময় জীবন বিষিয়ে তোলে।

সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের দেহের বার্ধক্য ও মৃত্যু থাকলেও চেতনার বার্ধক্য এবং মৃত্যু নেই। যদিও চেতনার শুরু, বেড়ে ওঠা, পূর্ণতাপ্রাপ্ত হওয়া এই দেহের ভেতেরেই। শরীর ছাড়াও চেতনার জীবন থাকে, থাকতে পারে। যেমন শিশুর জন্ম, বেড়ে ওঠা মায়ের গর্ভ ও পিতামাতাকে কেন্দ্র করে হলেও পরবর্তীতে শিশুর অস্তিত্ব এদের ওপর নির্ভশীল নয়। দৃশ্যমান একটা অস্তিত্ব থেকে জন্ম নেয়া আরেকটা দৃশ্যমান অস্তিত্ব যদি পূর্বের দৃশ্যমান অস্তিত্বের অনুপস্থিতিতে নিজের দৃশ্যমান অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, তাহলে একটা অদৃশ্য অস্তিত্ব- ‘চেতনা’ কেন তার পূর্বের দৃশ্যমান শরীরের অনুপস্থিতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না? চেতনার তো বেঁচে থাকতে মাটি-পানি-আলো-বাতাস থেকে উৎপাদিত খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া চেতনা একটা ‘অসীম’ শক্তি। এ শক্তির ব্যাপকতা, গতি, চাহিদা সীমাহীন। তাহলে এর সীমিত জীবন আমরা কিভাবে কল্পনা করতে পারি? এটা নিজেকে অপমান ও অস্বীকার করা নয় কি?

মানবচেতনা এক অদৃশ্য অসীম শক্তি। এর চাহিদা, আকাঙ্খা সীমাহীন। তাই এর জীবনও সীমাহীন। কারণ একটা সীমিত জীবনসম্পন্ন শক্তির ভেতরে অসীম আশা-আকাঙ্খা বসবাস করতে পারে না, যদি না তার জীবনটা সীমাহীন হয়। প্রাথমিকভাবে যদিও শরীরকে কেন্দ্র করেই চেতনার অস্তিত্বপ্রাপ্তি ও বিকাশ এবং সাধারণভাবে আমরা মনে করি এই নির্দিষ্ট শরীরের বাইরে এর অস্তিত্ব সম্ভব নয়, কিন্তু বিভিন্ন যুক্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় চেতনার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে। জীবনের দাবিও এটাই- কেউ মরতে চায় না, সবাই বাঁচতে চায়। সর্বোচ্চ সুখ-সমৃদ্ধি সহকারে বাঁচতে চায়। এ জন্যেই বিবেক ও মানবতার সমন্বয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ অপরিহার্য।

স্বর্গ-নরক বলে নয়, মানবচৈতন্যের স্বাভাবিক সীমাহীন আকাঙ্খা ও সীমাহীন জীবনের সূত্র ধরেই ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের প্রাপ্তি তার ওপর আবর্তিত হতে থাকবে। এটাকে হাল্কাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাই প্রতিটি মানুষ নিজের কাছেই সর্বদা প্রশ্নের সম্মুখীন। নিজেই নিজের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এজন্য ‘সুস্থ’ চিন্তা-চেতনার বিকাশ জরুরি। সমস্ত মানবজাতি এক, মানুষ হিসেবে সবাই ভাই ভাই- এই চেতনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিবেক, মানবতা ও মনুষ্যত্ববোধ সবার মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। আর এটা নিশ্চিত করতেই অন্যায়কে অন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হবে। কিন্তু ‘মানবস্বভাব’ এর সম্পূর্ণ উল্টো। যারা মানবস্বভাবকে ‘ধর্ম’ বলে অপপ্রচার চালায় তাদের এখানে যথেষ্ট চিন্তার বিষয় আছে। কোনো অন্যায়-অপরাধ সামান্যতম বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখার সুযোগ নেই। স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বেরও সুযোগ নেই। এমনটা করলে সমস্যা, হিংসা-দ্বেষ, ফেৎনা-ফ্যাসাদ কেবল বাড়তেই থাকবে।

চেতনা বিদ্যুৎ প্রবাহের মত। অতিদ্রুত একদেহ থেকে অন্যদেহে ছড়িয়ে পড়ে। একজাতি থেকে অন্যজাতিতে আছড়ে পড়ে। মৃত্যুর পরও কারও কারও চেতনা (চেতনার রূপকার্থে প্রয়োগ) অনেককে তাড়িয়ে বেড়ায়। এমনকি একটি দেশ, একটি সমাজ, একটি জাতিকে ভাঙ্গে-গড়ে। অবশ্য তা স্বত্ত্বেও প্রত্যেকের চেতনার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় থাকে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, প্রতিটি চেতনার কর্মফল, ভালো-মন্দ তার কাছেই ছিরে আসে এবং এটা হয় অতি দ্রুত, তাৎক্ষণিকভাবেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার চেতনা, ধর্মীয় চেতনা, বাঙ্গালি বা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেতনা, মৌলবাদী চেতনা- সর্বপ্রকার চেতনা এর আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে, যদি এ লেখা সত্যের কিছুটা হলেও কাছাকাছি হয়ে থাকে। আর যদি তেমনটা না হয় তাহলে নতুনভাবে ভাবতে হবে- মানবিক সর্বপ্রকার চেতনার উৎস, সংজ্ঞা নির্ধারণ, বিশ্লেষণ, ধ্বংসাত্মক ও গঠনমূলক চেতনার পার্থক্যকরণ ইত্যাদি করতে হবে। তা না হলে এই চেতনা নামক শক্তিই এ জাতির ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। কারণ বিশ্বের অপরাপর জাতির তুলনায় আর যাই হোক, অন্তত ‘চেতনাটা’ আমাদের একটু বেশিই

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/amibeadob/25824.html



মন্তব্য করুন