আমি বেয়াদব-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

আহমদ শফীর তেঁতুল বক্তব্য : হেফাজতকে মৃদু সতর্কবার্তা, আমার কৈফিয়ত এবং ছোট্ট একটি চ্যালেঞ্জ

লিখেছেন: আমি বেয়াদব

বহুল সমালোচিত আহমদ শফীর সেই তেঁতুল বক্তব্যের দীঘদিন পরও বিষয়টি মিলিয়ে যায়নি, থেমে থেমেই বিতর্ক চলছে এবং চলবে। যতদিন না হুজুরদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে পরিস্কারভাবে ভুল স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া হয়। ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার পরও বিষয়টি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে না, তবে কলঙ্কের পাশে একটি চাঁদও নিশ্চয় থাকবে, যা সবাই দেখবে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশ ও সমাজে সেই সংস্কৃতিটাই আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি; না রাজনীতিতে, আর না ধর্মীয় অঙ্গনে। কেন? উত্তর অনেক জটিল। সুতরাং কোনো অজুহাত নয়, নয় পাল্টা যুক্তি। ধর্মীয় একজন নগণ্য প্রতিনিধি হিসেবে আমি জনাব আহমদ শফীর বক্তব্যের অসতর্কতাজনিত ভুলগুলো স্বীকার করে এই বক্তব্যের দ্বারা সম্মানিত নারীসমাজের যেসব সদস্য মর্মাহত হয়েছেন বা অপমানিতবোধ করেছেন, তাদের নিকট নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। আমি মনে করি নারীজাতির প্রতি ইসলামের প্রদত্ত মর্যাদা ও অধিকার এ বক্তব্যে ফুটে ওঠেনি। তাই সারাবিশ্বের নারীসমাজ, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের অসংখ্য গার্মেন্টকর্মী, অন্যান্য শ্রমজীবী, নারী সমাজকর্মী, নারীবাদী ও মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষিকা, লেখিকা, সাংবাদিকাসহ সর্বস্তরের নারীদের প্রতি রইল অন্তরের অন্তস্থল থেকে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা রইল।

আমি সেই বক্তব্যের কিছুদিন আগে থেকেই নারীদের নিয়ে বাস্তব সমস্যার আলোকে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে একটি ব্লগে ধারাবাহিকভাবে লিখছিলাম। লিখছিলাম অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই। তা সত্ত্বেও একজন মুরব্বি আমাকে এ নিয়ে লিখতে মানা করলেন এবং বললেন এই গভীর ও জটিল বিষয়টি নিয়ে লেখার যোগ্যতা আমার নেই। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই গুরুজনের কথা সেদিন মেনে নিই। তাই সে লেখাগুলো এ মুহূর্তে সামনে আনার প্রয়োজনবোধ করছি না। যাহোক, প্রকৃতপক্ষে নারীদের প্রতি কোনো ধরনের অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা, অবমাননা, কটূক্তি এবং ইসলামপ্রদত্ত সম্মান মর্যাদা ও অধিকারসমূহের অপব্যাখ্যা করার কোনই অবকাশ নেই। এতে শুধু নারীদের নয়, সমস্ত মানবজাতিকেই অস্বীকার ও অপমানিত করা হয়।

সেই ব্লগের একটি লেখায় বলেছিলাম “শিক্ষিত মূর্খ ও ধর্মান্ধ মৌলবাদ” উভয়েই ইচ্ছায় অনিচ্ছায় সমাজ-রাষ্ট্রের ধ্বংস ডেকে আনে। এতে অনেকে আমার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমি তাদের বলতে চাই, প্রথমত তেঁতুল ইস্যু নিয়ে যারা সচেতনভাবে জলঘোলা করছেন আমি তাদের যেমন “শিক্ষিত মূর্খ” বলে কটাক্ষ করেছি, তেমনি যারা এ বক্তব্যের ভুল স্বীকারে টালবাহানা করছেন এবং অজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছেন তাদেরও “ধর্মান্ধ মৌলবাদ” বলে আক্রমণ করেছি। এ দু’দলের কোনোটাতেই আমি নেই। আমার অবস্থান সুস্পষ্ট। প্রথমত আমি ধর্মান্ধ নই, একজন যুক্তিবাদী ও বিচার-বিবেচনাবোধসম্পন্ন ধার্মিক। আমি একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ববান পুরুষ, রাষ্ট্রের কল্যাণকামী শিক্ষিত সচেতন নাগরিক। দ্বিতীয়ত, আমি যদি তাই হই, তাহলে দেশের “বিশেষ দুটি শ্রেণীকে” এভাবে আক্রমণ না করে আরো উত্তম ও শালীন ভাষায় সমালোচনা করা যেত। এটা আমি স্বীকার করি। প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাকেও প্রভাবিত করে। তাই প্রকৃত আদর্শ অবস্থান ধরে রাখা সবসময় সম্ভব হয় না।

হেফাজতের অপরিণামদর্শী ও উদ্যত তরুণ নেতাকর্মীদের আমি শুরু থেকেই সতর্ক করে আসছি। বাড়াবাড়ি মহান আল্লাহও পছন্দ করেন না। লংমার্চের গণজোয়ার দেখে হেফাজত ৫মে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয় এবং বিভিন্ন মহল থেকে সমঝোতা প্রস্তাব ও অবরোধ স্থগিতের যৌক্তিক আবেদন ফিরিয়ে দেয়। তাও সমস্যা ছিল না, কিন্তু সমস্যা হয়েছে বাড়াবাড়ি। ফলে সেখানে তারা চরম একটা মার খায়।

বিগত পাঁচ সিটি নির্বাচনে হেফাজত অবশ্যই ফ্যাক্টর ছিল। কিন্তু সমস্যা সেই একটাই, বাড়াবাড়ি। আমি দু’দফা সিটি নির্বাচনের পরপরই ফেসবুকে বলেছি এ বিজয় হেফাজতের নয়, সুতরাং তারা যেন কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি না করে। আশঙ্কা করছিলাম আরেকটি মার খাওয়ার। অবশেষে তাই হল। তেঁতুল তত্ত্বে হেফাজত আকাশ থেকে পাতালে নেমে এল। অবশ্য দোষ খুঁজলে সবারই পাওয়া যাবে। শ্রদ্ধেয় আহমদ শফী একজন প্রবীণ আলেম। এখনকার পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের সামর্থকে তার বয়স সাপোর্ট করে না। তাছাড়া দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কয়েকশ’ বছর আগের উপমহাদেশে যে ইসলাম এসেছিল, তারপর অসংখ্য অলিগলি ঘুরে, অজস্র বাধা পেরিয়ে আমাদের মুরব্বিরা যে ইসলাম পেয়ে ধন্য হয়েছেন তা একদিক থেকে অনেকটা খাঁটি হলেও অন্যদিক থেকে বর্তমান বিশ্বসভ্যতা ও অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে আমাদের সেই “প্রাপ্ত ইসলাম” ও “প্রকৃত ইসলাম” নিয়ে নতুন করে ভাববার দাবি রাখে বলে আমি মনে করি। মহান আল্লাহ স্বয়ং কোরআনে বলেন, “তারা কি ‘কোরআন’ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?” ৪৭:২৪। সুতরাং হেফাজতের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিনীত অনুরোধ করব, বাড়াবাড়ি না করে, প্রতিশোধস্পৃহায় না জ্বলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সবার প্রতি দরদী মানসিকতা লালন করার। নইলে কিন্তু একের পর এক মার খেতেই হবে।

আমার ছোট্ট চ্যালেঞ্জ এটাই, সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের পথে আপোষ নেই। সেই সূত্রেই ইসলাম, মানবতা, বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, মানবজাতির বিবদমান শিবিরের ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতার অশুভ ছায়া থেকে যতটুকু সম্ভব বিরত রাখা বিরত থাকা এবং পরিস্থিতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে এর কারণ বের করা ও প্রতিকারের পথ খোঁজা। আমি বিশ্বাস করি, ইসলাম সঠিকভাবে উপস্থাপিত হলে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এর ছায়াতলে আসতে বাধ্য। সুতরাং এক্ষেত্রে আরো উত্তম পথ, অধিকতর যুক্তি-বুদ্ধির প্রয়োগ এবং মানসম্পন্ন উপস্থাপন-কৌশল ও সময়ের দাবি অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বর্তমান কোনো ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠীকে সমর্থন করতে না পারলে এবং সঙ্গে কাউকে না পেলে আমি একলা চল নীতি অনুসরণ করব।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/amibeadob/25450.html

 2 টি মন্তব্য

  1. আজাদ মাষ্টার

     প্রত্যেকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবসরে যাওয়ার একটা বয়স নির্দিষ্ট থাকে । ৯০ বছর বয়সে হুইল চেয়ারে বসে কানে এবং চোখে ভালোমতো না দেখে  কিভাবে তিনি দৈনন্দিন প্রশাসনের কাজগুলা নির্বাহ করেন ?  বাস্তবে বিবেচনায় এইটা সম্ভব না ।

    1. আমি বেয়াদব

      ধন্যবাদ।এ ব্যাপারে আপনি যা বলবেন, সম্ভবত আমি এরচেয়ে বেশি বলতে পারব। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরগুলোতে সর্বোচ্চ পদাধিকারি বা পরিচালকের কোনো ক্লাশ নিতে হয় না। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলো এর ব্যতিক্রম। এসবের বহুবিধ বাস্তব কারণ আছে। কারণগুলো সম্ভবত আপনারাও খোঁজ করলে পাবেন। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ নির্দিষ্ট বয়সে অবসর গ্রহণের পরও অন্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয় এবং তা ভালোভাবেই চালিয়ে যায়। অভিজ্ঞতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এমনকি লুফে নেয়। যাহোক, ব্যাপারটা আমিও সমর্থন করি না, কিন্তু এর পেছনে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণ রয়েছে।সুতরাং প্রতিপক্ষের প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়লেই এর মীমাংসা আসবে না, কীভাবে এসবের শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যায় তাই কাম্য। যেহেতু তরুণ প্রজন্মের বিশাল অংশ আজ ঐক্যবদ্ধ, তাই আমি মনে করি সমাধান বেশি কঠিন নয়। আর আমার কথা হচ্ছে, বিচ্ছিন্নভাবে শুধু মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কার করা যাবে না, সর্বস্তরেই সংস্কার করতে হবে। যেমন রাজনীতিতে, আমেরিকায় দু’বারের বেশি কেউ নির্বাচন করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দুই নেত্রী?

মন্তব্য করুন