আমি বেয়াদব-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

শান্তির খোঁজে

লিখেছেন: আমি বেয়াদব

সুখ বা শান্তি বলতে আমরা কী বুঝি? সুখ হচ্ছে হাল্কা ও ক্ষণস্থায়ী মানসিক আনন্দানুভূতি যা ধনসম্পদ, সম্মান, যৌনসম্ভোগ, প্রেম ইত্যাদি জাগতিক বিষয়াবলীর দ্বারাও ‌অর্জন সম্ভব। কিন্তু শান্তি হল দীর্ঘস্থায়ী বা নিরবচ্ছিন্ন এক অপার মানসিক সুখানুভূতি, যা কেবল বৈষয়িক কোনো কিছুর দ্বারা অর্জন সম্ভব নয়। সম্ভবত এটা কোনো এক মহান সত্তা বা চিরঞ্জীব শক্তির নিকট সর্বান্তকরণে আত্মসমর্পনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। শান্তি বলতে যুদ্ধহীন বিশ্ব বুঝায় না। যদি পরিবার সমাজ রাষ্ট্র ও বিশ্বের ইতিবাচক অবস্থা ব্যক্তির মনে সেই অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে অথবা ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে জ্ঞান অর্জন, সত্যের সন্ধানলাভ ও ন্যায়-নীতির অনুশীলনের মাধ্যমে মহান সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে তাহলেই শান্তির স্পর্শপ্রাপ্তি সম্ভব।

বার্ট্রান্ড রাসেলকে নাকি প্রশ্ন করা হয়েছিল, শান্তি কিভাবে পাওয়া যাবে। তিনি বলেছিলেন “হৃদয়ে শান্তির ঘর বাঁধতে হবে।” হ্যাঁ, কথা সত্য। হৃদয়ে শান্তির ঘর বাঁধতে হবে। কিন্তু কিভাবে বাঁধতে হবে? হৃদয়ে শান্তির অভাবে আইনস্টাইনেরও স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল। পৃথিবীর বহু খ্যাতিমান শিল্পী-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানী শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর দ্বারা জগৎবাসীকে শান্তির সন্ধান দিতে পারেননি। এমন কি তারা নিজেরাও শান্তি অনুভব করেননি। এর মধ্যে অনেকেই সাংসারিক পার্টনারের সঙ্গে পর্যন্ত সহনশীল আচরণ, সহানুভূতি প্রদর্শন এবং সমন্বয়ধর্মী বুঝাপড়া করতে পারেননি। আর এখানেই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরাজয়। ফেরেশতা ও পশুর মধ্যে শান্তি-অশান্তির অনুভূতি নেই। শান্তির প্রশ্ন কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই। হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-মুসলিম-ইহুদি- মানুষ মাত্রই শান্তির প্রত্যাশী। শান্তিই সবার চুড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সুতরাং মানুষের মূল্যায়ন কাজ বা অর্থের মাধ্যমে নয়, শান্তির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাধ্যমে।.

বিজ্ঞানের মুহুর্মুহু আবিষ্কারে আমরা সবাই চরম উৎফুল্ল। চারদিকে পৃথিবীর অগ্রগতি; আলো ঝলমল শহর, লাল-নীল বাতি। শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, তথ্যের অবাধ প্রবাহ- এক কথায় সর্বক্ষেত্রেই অত্যাশ্চর্য উন্নতি। তা সত্ত্বেও কেউ কেউ চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি ও আমাদের জীবনমান নিয়ে দারুণ হতাশা ব্যক্ত করেন। আসলে কোন্‌টা সঠিক? শিক্ষালয়ে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি ঘটে যে, আগের ক্লাশের শিক্ষক মহোদয় ফুরফুরে মেজাজে পৃথিবীর স্বর্গে রূপান্তরিত হওয়ার বাস্তবতা বর্ণনা করেছেন। পরের ক্লাশের শিক্ষক এসে অচিরেই পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে এমন তথ্য-উপাত্ত পেশ করেন। প্রবীণদের মুখে শুনি আমাদের গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ও গোয়াল ভরা গরুর কথা। আবার নবীনরা বলে বেড়ান অতীতের দুর্ভিক্ষ, অশিক্ষা, মূর্খতা ও দারিদ্রের কথা। তাই প্রশ্ন জাগে, এ মুহূর্তে আমাদের জীবনমান কোন অবস্থায় আছে। আগের চেয়ে ভালো, না খারাপ?

অর্থনীতিতে বলা হয়েছে মানুষের অভাব অসীম, কিন্তু সম্পদ সীমিত। অভাব বলতে এখানে বস্তুগত অভাবকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ অবস্তুগত অভাব বা অন্যকিছু বুদ্ধি বা মানবমস্তিষ্ক স্বীকার করে না। প্রকৃতপক্ষে বস্তুগত অভাবের পাশাপাশি মানুষের অবস্তুগত অভাবও রয়েছে, যা আরও বেশি অসীম। সম্ভবত এ সম্পর্কে আলোচনা বা সমাধান প্রচলিত অর্থনীতির বইয়ে নেই। তাছাড়া বস্তুগত অভাব মূলত অসীম নয়, এর একটা সীমা আছে। অসীম কেবল মানুষের ইচ্ছা ও আশা-আকাঙ্খা, যা সম্পূর্ণই মানসিক ব্যাপার। মানসিক অভাব (অভাবের অনুভূতি) বা চাহিদা শুধু অর্থ ও বস্তু দ্বারা পূরণ সম্ভব নয়। সুতরাং ইচ্ছায় হোক অথবা অনিচ্ছায়- অর্থ ও বস্তুর পাশাপাশি এমন কিছুও খুঁজতে হবে যা অমাদের মানসিক অসীম চাহিদা পূরণ করবে। নৈরাশ্যবাদের কালো গহ্বর থেকে রক্ষা করবে। এক্ষেত্রে অনেকে বলতে পারেন সব বয়সের নারী-পুরুষের চিত্তবিনোদন ও খেলাধুলার কথা। কিন্তু এগুলোও সাময়িক। আমরা লক্ষ করি না যে চিত্তবিনোদন ও খেলাধুলার মাধ্যমে যদিও মনে সাময়িক আনন্দ অনুভূত হয়, কিন্তু মনের স্থায়ী শান্তির চাহিদা পূরণ হয় না। বরং পরবতীতে এগুলো অশান্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষ বিশেষ সময়ে হতাশা গ্রাস করে, আত্মহত্যার প্রবণতা জেগে ওঠে। উগ্রতা, বদমেজাজ ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে সেই মানুষটি মেতে ওঠে।

মানুষের হৃদয় অতি স্পর্শকাতর একটি অঙ্গ। চোখে যেমন সামান্য একটি ধূলিকণা পড়লেও একে বৃহৎ পাথরখণ্ড বলে মনে হয়, তেমনি কারও অন্তরে যদি বিশেষ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল, সম্প্রদায় বা জাতির প্রতি সামান্যতম ঘৃণা, হিংসা, ক্ষোভ কাজ করে তাহলে সেই অন্তরটি অশান্তিতে ভরপুর থাকে। এমন অন্তর নিয়ে স্রষ্টার উপাসনা বা প্রার্থনা কোনোটাই চলতে পারে না। আমাদের অন্তরকে সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। সর্বপ্রকার ঘৃণা-ক্ষোভ, হিংসা-দ্বেষ থেকে বিরত থাকতে হবে। জগতের সমস্ত অন্যায়-অত্যাচারের জন্য নিজেকেও আংশিক দায়ী করে যৌক্তিক পথ ও পন্থা তালাশ করতে হবে। দৈনন্দিন আত্মসমালোচনায় অংশ নিয়ে দৃষ্টিকে বারবার নিজের দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

কষ্ট ও অশান্তি এক কথা নয়। কষ্ট সাধারণত শারীরিক। কষ্টের বিপরীত আরাম। শান্তির বিপরীত অশান্তি। আরাম ও কষ্ট ভোগ করে শরীর। শান্তি ও অশান্তি ভোগ করে হৃদয় বা মন। আমরা মনে যে কষ্ট পাই তা মূলত অশান্তিরই একটা অংশ বা পর্যায়। মনের কষ্টগুলো ধীরে ধীরে অশান্তিতে রূপ নেয়। একজন মানুষের নারী-বাড়ি-গাড়ী ও ভোগ-বিলাসের সীমাতিরিক্ত উপকরণ তাকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। আবার এমুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত, নিগৃহীত ও বিপদগ্রস্থ মানুষটিরও পৃথিবীতে বেঁচে থাকা অবস্থায়ই শান্তির ব্যবস্থা আছে। এখন প্রশ্ন হল, সেটা কিভাবে?

উন্নত বিশ্বে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা ও ভোগ-বিলাসের উপায়-উপকরণ অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও সেখানে আমাদের দেশের তুলনায় আত্মহত্যার পরিমাণ, পাগলা গারদ, খুন-ধর্ষণ, ছিনতাই, ছাড়াছাড়ি-মারামারিও অনেক বেশি। বৃহত্তম মানব-সমাজের একক ইউনিট- পরিবারব্যবস্থা সেখানে ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানকার নাগরিকরা নিজেদের কেবল শারীরিক প্রবৃত্তিজাত চাহিদা পূরণে এত ব্যস্ত যে, অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে দূরের কথা, নিজের মানসিক সমস্যাগুলো নিয়েও ভাববার সময় নেই। ওরা পুরোপুরি যান্ত্রিক। যান্ত্রিক হলেও তো ভালোই ছিল, হৃদয়ে অশান্তি স্পর্শ করতে পারত না। কারণ যন্ত্রের কোন হৃদয় নেই। সমস্যাটা এখানেই। অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস সারা জীবন ধরে মানসিক সমস্যা ও অশান্তি চাপা দিয়ে রাখে। কিন্তু বিশেষ সময় ও পরিস্থিতিতে যখন তা বিস্ফোরিত হয় তখন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। আমাদের বাংলাদেশে এ সমস্যাটা দিন দিন বাড়ছে। এজন্য যুবসমাজ ও ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক সমস্যা ও অশান্তির ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, নাচ-গান ও তথাকথিত প্রেম-প্রীতি থেকে তাদের নিপারদ দূরত্বে রেখে সমাজ ও জীবন-বাস্তবতার কঠিন সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা শেখাতে হবে।

সমপ্রতি মিডিয়ায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার সংবাদ ঘন ঘন আসছে। আত্মহত্যা মানে নিজেকে খুন করা। অন্যকে খুন করা তো অহরহ ঘটছে। মানুষের জীবন আজ মূল্যহীন, অর্থহীন। যেখানে সেখনে লাশ পড়ে থাকে। মাত্র দশ হাজার/বিশ হাজার টাকার জন্য অথবা সামান্য কারণে কাউকে মেরে ফেলা এখন মামুলি ব্যাপার। জীবনের নিরাপত্তা নেই, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই, গঠনমুখী বাকস্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতা নেই। এসব কি প্রমাণ করে, আমাদের জীবন খুব সুখী! শান্তিময়? আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মানুষের অন্তরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। তথাকথিত সভ্যতা, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান আর যাই পারুক, মানুষকে শান্তি দিতে পারছে না। অথচ এটাই সমস্ত মানুষের কাজ-কর্ম, চিন্তা-প্রচেষ্টা ও সবরকম তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য।

শতকরা ৮০ ভাগ ধর্মানুভূতি সম্পন্ন মানুষের এই বাংলাদেশেও কি ধনী-গরীব, কি ধার্মিক-অধার্মিক, কি শিক্ষিত-অশিক্ষিত জীবনে কখনও আত্মহত্যার ইচ্ছে জাগেনি এমন মানুষের সংখ্যা বিরল। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এবং কখন একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে চান? প্রেমে ব্যর্থতা, চাকরিতে ব্যর্থতা, শিক্ষা-ভোগ-বিলাস ইত্যাদিতে ব্যর্থতা এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অশান্তির চুড়ান্ত পর্যায়ে একজন মানুষ তার নিজের জীবনটিকে আর মূল্যবান মনে করেন না। সুতরাং তিনি তার জীবন এ মুহূর্তেই শেষ করে দিতে চান। অনেক সময় সাথে আরও দশ বা একশতজনসহ। এই যে অশান্তি, এটা কিভাবে মনের মধ্যে উৎপন্ন হয়? শুধু কি জাগতিক অভাবই এর জন্য দায়ী? না, বরং প্রত্যেক মানুষের মনে একটা আধ্যাত্মিক ও স্বর্গীয় চাহিদা রয়েছে। যে কারণে জগতের সবকিছু পেয়েও একজন মানুষের মন শান্তি লাভ করতে পারে না। প্রাণী-পদার্থ-উদ্ভিদ নিয়ে আজ প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। গবেষণা নেই কেবল মানুষ নিয়ে অর্থাৎ ‘প্রকৃত মানুষ’ নিয়ে। মানুষের অভাব বা চাহিদা দু’প্রকার। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক। জাগতিক চাহিদা আবার দু’প্রকার। শারীরিক ও মানসিক। শারীরিক চাহিদা (খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান ও চিকিৎসা) বা প্রয়োজন সীমিত। কিন্তু মানসিক বস্তুগত চাহিদাগুলো অসীম যা কখনও পূরণ হবার নয়। আর আধ্যাত্মিক চাহিদা সর্বাবস্থায় সম্পূর্ণরূপে অসীম।

শান্তি সম্ভবত কোনও লৌকিক বিষয় নয়, অলৌকিক। মানুষের আত্মাও অলৌকিক। ধর্ম যেসব অলৌকিকের কথা বলেছে সেসব অলৌকিকতায় বিশ্বাস ছাড়া মানুষের আত্মা শান্তি পাওয়ার পথ নেই। ধর্মে বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, রূহ মহান আল্লাহর হুকুম। এটা দুনিয়ার কোনো বস্তু নয়। শরীর মাটি-পানি-আলো-বাতাসের দ্বারা সৃষ্টি। এর খাদ্যও মাটি-পানি-আলো-বাতাস থেকেই উৎপন্ন হয়। কিন্তু আত্মা বা রূহ যেহেতু স্বয়ং আল্লাহর হুকুম, এর খাদ্য বা চাহিদাও পূরণ হয় মহান আল্লাহর হুকুম-আহকাম মানার মাধ্যমেই। সুতরাং আমার দৃষ্টিতে কোনো নাস্তিকের পক্ষে, বা ধর্মীয় বিধি-নিষেধ অমান্যকারী আস্তিকের পক্ষে এমনকি ইলম ও এখলাসবিহীন ধার্মিকের পক্ষেও নিরবচ্ছিন্ন শান্তির স্পর্শপ্রাপ্তি সম্ভব নয়। বস্তুবাদীরা অবশ্য আমার এ কথার সঙ্গে একমত হবেন না। আবার তারা যথার্থ শান্তির সংজ্ঞাও দিতে পারবেন না। শান্তির মডেল তো দিতে পারবেনই না। আর আমি যে শান্তি নিয়ে এখন লিখছি, শান্তির ধারে-কাছেও যেতে পারিনি। আদৌ পারব কি না সন্দেহ। কেবল শান্তি সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রাসঙ্গিক কিছু সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করব। মহান আল্লাহ তৌফিক দাতা।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/amibeadob/25331.html



মন্তব্য করুন