এ হুসাইন মিন্টু-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

দেশ আমাদের, দায়িত্বও আমাদের

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু

মানুষের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা আছে কিনা আমার জানা নেই। দুই হাত, দুই পা, চোখ, কান, নাসিকা, গলা ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অধিকারী হলে অথবা দেখতে অবিকল মানুষের মতো হলেই কি কাউকে মানুষ বলা যায়? কেউ বলে, মান ও হুষ মিলে মানুষ হয়। আবার কেউ বলে, ভালো মন্দের যে প্রার্থক্য বুঝে অর্থাত যে লোক বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন তাকেই মানুষ বলে। এই বাক্যটিকে শুদ্ধ মেনে নিয়ে যদি প্রশ্ন করি, আমরা যদি নিজেকে মানুষ বলেই দাবী করি তাহলে আমাদের বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগের বহির্প্রকাশ কোথায়? কেন আমরা ভালো মন্দের তফাত বুঝতে পারি না? আমাদের চোখের সামনে যখন আমারি এক ভাইকে পুড়িয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়, তখন কেন আমাদের মন কেঁদে ওঠে না? দ্বগ্ধ মানুষটির পাশে না দাড়িয়ে কেন আমরা নিজের জীবনের মায়া করে দৌড়ে পালিয়ে যাই অথবা চিত্তরঞ্জনের জন্য দাড়িয়ে দাড়িয়ে তামাশা দেখি? নিজ জীবনের মায়া তো পশুরও আছে। সেও নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড় দিতে পারে। তাহলে পশু ও আপনি আমার মধ্যে প্রার্থক্যটা কোথায়? এই প্রার্থক্য কি শুধু শারীরিক গঠনে?

বাঙালী হওয়া তো দূরের কথা, আমাদের এ হেন দৈনন্দিক কর্মকান্ডের পর নিজেদেরকে মানুষ বলে দাবী করতে পারি কি না, সেটাই এখন অনেক বড় প্রশ্ন। বাঙালীদের ইতিহাস তো আরও গৌরবের। নিজেকে আমরা কিভাবে বাঙালী বলে পরিচয় দেবো? হিসেবটা যদি পলাশী থেকেই শুরু করি, তাহলে কি দেখা যায়। সেই মহনলাল থেকে শুরু করে খোদিরাম বসু, প্রীতিলতা, চিত্তরঞ্জন সাহা, এ কে ফললুল হক, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও সকল মুক্তিযোদ্ধা, দুই লক্ষ বীরঙ্গনা, নূর হোসেন অথবা ডাক্তার মিলন, এদের ইতিহাস দেখলে বা পড়লে বুঝা যায় বাঙালী কাকে বলে? বাঙালীদের ইতিহাস, মাথানত না করার ইতিহাস। বাঙালীদের ইতিহাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ইতিহাস। ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য প্রয়োজনে জীবন দেওয়ার ইতিহাস, আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। এক ভাইকে কেউ কুপিয়ে হত্যা করবে, আরেক ভাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার তামাশা দেখবে, এমন ইতিহাস বাঙালীদের নেই। অন্যায়ের কাছে নত হওয়ার নজির বাঙালীদের নেই।

গুটা কয়েক পরিবারকে বাদ দিলে, ১৯৭১এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশের প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কম বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে। কতিপয় কিছু অতি লোভী ও এ দেশীয় পাকিস্তানী দোসরদেরকে গণনায় না ধরলে এ দেশের প্রতিটি মানুষ সেই যুদ্ধে তাদের স্বজন হারিয়েছেন। আর যারা পাকিস্তানীদের সাথে মিলে তখন এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেছে। আমার আপনার মা বোনের সম্ভ্রম লুটেছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর অনেক চড়াই উত্রাইকে ডিঙ্গিয়ে এসে আজকে যখন তাদের বিচার শুরু হয়েছে, তখন কিছু স্বার্থনেষী মহল, ক্ষমতালোভী কু-চক্রী ও তত্কালীন রাজাকার আল-বদরদের কিছু চেলাপেলা ও দোসরেরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। পুলিশের উপর শারীরিক আঘাত হানছে, গাড়ীতে আগুন দিচ্ছে, জীবন্ত মানুষকে অগ্নি দগ্ধ করে নৃশংস ভাবে হত্যা করছে, প্রকাশ্য দিবালোকে বোমাবাজী করছে, মানুষের জানমালের অবর্ণনীয় ক্ষতি সাধন করছে! আর আমাদের কিছু অতি লোভী অসত সংবাদ কর্মী বা পত্রিকা ও টেলিভিশন মালিক টাকার লোভে বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক সেই ছবি অনবরত গণ মধ্যমে প্রকাশ করে এই নৃশংসতাকে যেন আরও বেশি দিচ্ছে এবং দেশের ভেতরে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরীতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। যেমনটি করা হয়ে ছিল ১৯৭৫ সালে, জাতির জনককে হত্যার আগে।

এত কিছু দেখার পরও আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই মন প্রাণ থেকে। শিক্ষিত সমাজ, যারা এই দেশটাকে সত্যি ভালোবাসি। ছাত্র সমাজ, যারা আগামী দিনের কর্ণধার। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, যারা দেশেপ্রেমের সাইনবোর্ড শরীরে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান। কারো টনক নড়ছে না! আমরা একবারো রাস্তায় নেমে এসে বলছি না, যারা আমার ভাইকে হত্যা করে ছিল, আমার মা বোনের সম্ভ্র্ম লুটে ছিল, আমরা তাদের বিচার চাই এবং এই বিচার যে পর্যন্ত শেষ না হবে, আমরা এই সরকারের সাথে আছি। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ভুল ভ্রান্তি থাকতেই পারে, কিন্তু তাই বলে কি সেই ভুলের সাজা হিসেবে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করাটা কি সমুচীন হবে? একবার ভেবে দেখা দরকার, এই আওযামীলীগ ব্যতীত এই বিচার আর কেউ করবে কিনা। এই দেশে গণ প্রতিনিধিত্ব করার মতো দুইটা দলই আছে, একটা বিএনপি, আরেকটা আওয়ামীলীগ। বিএনপি-র গত পাঁচ বছরের কর্মকান্ড ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করা, এগুলো দেখে কি মনে হয় এরা আগামীতে ক্ষমতায় গেলে এই বিচার কার্য অব্যাহত রাখবে? কখনোই না। এমন কি বিএনপি-র চেয়ারপারসন টেলিফোনে যুদ্ধাপরাধীদেরকে রাজবন্ধী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি তাদের মুক্তি দাবী করেছেন। এখন ভেবে দেখুন, যারা ক্ষমতার বাইরে থেকে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দাবী করতে পারে, তারা ক্ষমতায় গেলে এদেরকে ছেড়ে দিতে কতক্ষণ লাগবে? ভেবে দেখুন, যারা আপনার ভাইয়ের বুকে গুলি চায়ে ছিল, যারা আপনার বোনের সম্ভ্রম লুটে ছিল, তাদের বিচার চান কিনা?

গত এক বছরে রাজনীতির নামে বাংলাদেশে কি হয়েছে সে কথা কারো অজানা নয়। জানুয়ারি থেকে শুরু করে নভেম্বার পর্যন্ত যদি হিসেব করি তাহলে দেখা যায় গত এগারো মাসে প্রায় তিন শতাধিক লোককে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে! কতজন আহত হয়েছেন, তা জরিপের করে বের করতে হবে। যেটাকে পরে রাজনৈতিক সহিংসতা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা মোটেও রাজনৈতিক সহিংসতা নয়। রাজনৈতিক সহিংসতায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা একে অন্যের উপর চড়াও হবে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জানমালের ক্ষয় ক্ষতি হওয়ার কথা। কিন্তু ঐ তিনশত লোকের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা কর্মী ছিলেন হাতে গুণা দুই একজন, বাকীরা সবাই সাধারণ মানুষ। যাদের অধিকাংশই নৃশংসতার শিকার হয়েছেন পেটের দায়ে নিজ কর্মক্ষেত্রে যোগদান বা সেখান থেকে ফেরত আসার সময়। ৪০বছরের আনোয়ারা বেগম, সরাসরি যার মাথার উপর ককটেল নিক্ষেপ করা হয়ে ছিল। সেই ককটেলের আঘাতে মগজের কিছু অংশ উড়ে চলে গিয়ে ছিল যার। ‘চিকিত্সকেরা যখন আনোয়ারার মাথায় পেঁচানো কাপড় সরালেন, অনুধাবন করলেন তাঁর মাথা থেকে গলগলিয়ে বের হতে থাকা রক্ত বন্ধ করাটাই যথেষ্ট কাজ নয়, তাঁর খুলিটা রক্ষা করা হবে আসল কাজ। অস্ত্রোপচারের টেবিলে আনোয়ারা চাঁদির হাড়ের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, বের হয়ে ছিল তাঁর মগজের উপরিভাগ। ক্ষত থেকে বের হচ্ছিল গান পাউডারের উগ্র গন্ধ।’ আনোয়ারা বেগম সাধারণ মানুষ। একটি ব্যাংকে রান্নাবান্নার কাজ করতেন। সেদিন কাজ শেষে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। আর ফেরার পথেই তাকে এই বর্বরতার শিকার হতে হল! সাবেদ আলী নামের একজন সিএনজি চালকের গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ছোড়া হলে তিনি আগুনে দগ্ধ হন। তার বাম হাতের মাংস হাড়সহ শরীরের অনেকাংশ পোড়ে যায়। রুবেল নামের আরেক অটোরিকশা চালকের গাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণে আগুন লাগে। দুর্বৃত্তরা প্রথমে তার অটোরিকশা উল্টে দেয়। এতে ভেতরে আটকা পড়েন তিনি। এর পর ককটেল ছোড়া হয়। হামলাকারী যে তাঁকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল, এখানে কি তা পরিষ্কার নয় ? মানুষ ভর্তি বাসে যাত্রী সেজে ওঠে গান পাওডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে নেমে পড়ছে । এ রকম অসংখ্য রোবেল ও সাবেদ আলীর করুণ ও হৃদয় বিদারক গল্প তৈরী হয়েছে গত এগারো মাসে।

এসব দেখার পর কি মনে হচ্ছে না এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও পূর্ব পরিকল্পিত? কোনো একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এসব করা হচ্ছে? সেই উদ্দেশ্যটা কি? জামাত কি কখনো এই দেশে একক ভাবে ক্ষমতায় যেতে পারবে? তাদের উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। যে কোনো ভাবে এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এই সরকার বিদায় মানেই যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি। যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন এখন পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। তাই দেশের ভেতরে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরী করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে এই সরকার দেশ পরিচালনায় অক্ষম। জনগণের জানমালের নিরপত্তা দিতে ব্যর্থ। সীমীত অর্থনৈতিক সামর্থ, অপ্রতুল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন, অসাধু সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী, ইত্যাদি মিলিয়ে সরকারের ব্যর্থতা থাকতেই পারে। তাই বলে তাদের সেই ব্যর্থতার কারণে আমরা আমাদের নিজেদেরকে কেন সাজা দেবো? কেন ৪২ বছরের বহুল প্রত্যাশিত বিচারের মুখে পানি ঢেলে দেবো? এখনি সময় এসব নিয়ে ভাববার। আমরা বসে থাকলেও চক্রান্তকারীরা কিন্তু মোটেও বসে নেই। যে তিনশত লোক নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন তারাও কিন্তু আপনার আমার মতো কারো ভাই, বোন, আত্মীয় স্বজন। আজ তাদের সাথে হয়েছে, আগামীকীল যে আপনার আমার সাথে হবে না তার কি গ্যারান্টি? এটা আমাদের দেশ, এবং এই দেশের সবকিছুর দায়িত্ব আমাদের উপরেই বর্তায়। বিদেশীরা কেউ এসে আমাদেরকে এসব ঠিক করে দিয়ে যাবেন না। আমাদের দেশের ভালো মন্দ আমাদেরকেই দেখতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কিছুতেই বাধাগ্রস্থ না হয় সেই প্রেক্ষিতে আমাদেরকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে পুরাতন ও নতুন খুনিদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসতে হবে।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/ahussainmintu/25894.html

 2 টি মন্তব্য

  1. ফাতেমা জোহরা

     বিদেশীরা কেউ এসে আমাদেরকে এসব ঠিক করে দিয়ে যাবেন না। আমাদের দেশের ভালো মন্দ আমাদেরকেই দেখতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার যাতে কিছুতেই বাধাগ্রস্থ না হয় সেই প্রেক্ষিতে আমাদেরকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে পুরাতন ও নতুন খুনিদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসতে হবে।—হ্যাঁ,এইটাই হল আসল কথা। কিন্তু দেশের বেশীরভাগ মানুষ বোধহয় এটা বুঝতে পারছে না। তা না হলে,লোকজন এখনো কেন বিএনপি-জামাতের সহিংসতার প্রতিবাদ করছে না??? কেন যে মানুষ এখনো চুপ করে আছে সেটাই আমি বুঝতে পারি না!!!                                                                                                      এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি,অনেক দিন পর লিখলেন। বরাবরের মত এই লেখাটাও অসাধারন হইছে। আর একটা কথা,আপনি চাইলে ইস্টিশন ব্লগে লিখতে পারেন কিন্তু। ব্লগটা বেশ ভালো। ভিজিট করে দেখতে পারেন। 

  2. এ হুসাইন মিন্টু

    গণ বিস্ফোরণ একদিন হবেই। অন্ধকার যত গভীর হয়, আলোর প্রবেশ তত তাড়াতাড়িই ঘটে। আগামী বইউমেলাকে সামনে রেখে সামান্য ব্যস্ত আছি।  মেলা যাক পরে ভেবে দেখবো।  আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

মন্তব্য করুন