এ হুসাইন মিন্টু-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

মহাজোট সরকারের মহা উন্নয়ন যজ্ঞ-৪, প্রসঙ্গ শিক্ষা

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু

বলা হয়ে থাকে, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। একমাত্র শিক্ষিত জাতি-ই সদম্ভ ও মহিমায় বিশ্ব দরবারে শির উচুঁ করে দাড়াতে পারে। বস্তুত শিক্ষাই জ্ঞান ও মননের সূতিকাগৃহ। শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও এর গুণগতমানের উৎকর্ষ জাতির অগ্রগতির অন্যান্য অনুষঙ্গকেও চালিত করে, পথনির্দেশনা দেয়। অন্যদিকে অশিক্ষিত জাতি একমাত্র পরের গোলামী ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অধ্যাবদি শিক্ষাখাতে যে গুনগত ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তার জন্যে ৯০ ভাগের বেশি প্রশংসার দাবিদার আওয়ামীলীগের(১৯৯৬-২০০১ ও২০০৮-২০১৩) দুই ট্রামের সরকারকে, অর্থাত শিক্ষা বান্ধব নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে।

শিক্ষা একটি ছোট শব্দ হলেও সমাজে এর ব্যপ্তি ও পারিপার্শ্বিক বিস্তার ব্যপক। শিক্ষার কথা বলতে গেলেই বলতে হয়, শিক্ষা নীতির কথা, ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা, মেধাবী ও অভিজ্ঞ দক্ষ শিক্ষকের কথা, সর্বপোরি সরকারের শিক্ষাবান্দব ও সহায়ক মনমানসিকতার কথা। আর এই সবগুলো জিনিসই ভালো ও গুনগত শিক্ষার জন্যে একটা আরেকটার সম্পূরক। আর এসবের উন্নয়নের জন্যে নিরলস ভাবে কাজ করছে বর্তমান সরকার অর্থাত মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষানীতি
শিক্ষানীতির কথা বললে বিশদ আলোচনা করতে হয়, যতদূর সম্ভব সংক্ষেপে ও সীমীত আলোচনায় আমি সেই ব্রিটিশ আমল থেকে ২০১০ শিক্ষানীতির ব্যাপারে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। বর্তমান সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ছয়টি শিক্ষানীতি বা রিপোর্ট প্রণীত হলেও গত চার দশকে তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকার দলমত নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে তার বাস্তবায়ন শুরু করে। প্রাক্-ব্রিটিশ সময় পর্যন্ত শিক্ষা প্রসার ও উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি, সম্প্রদায়, প্রতিষ্ঠান ও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ঘোষিত শিক্ষানীতি হলো বাংলা তথা ভারতের প্রথম সরকারি শিক্ষানীতি। এর মাধ্যমে নীতিগতভাবে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এরপর বহুল আলোচিত অ্যাডাম রিপোর্ট (১৮৩৫-১৮৩৮) -এর উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান সৃষ্টি (১৯৪৭) পর্যন্ত অন্তত আটটি কমিশন, কমিটি ও সংস্কার প্রতিবেদন প্রণীত হয়েছে। এর মধ্যে হান্টার কমিশন রিপোর্ট (১৮৮২) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত নাথান কমিটি (১৯১১) রিপোর্ট খুবই পরিচিত। পাকিস্তান আমলে (১৯৪৮-১৯৭১) বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন ও কমিটি রিপোর্ট প্রণীত হয়েছিল। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সংস্কার (আতাউর রহমান খান) কমিশন ১৯৫৭, জাতীয় শিক্ষা কমিশন (এস এম শরিফ কমিশন) রিপোর্ট ১৯৫৯, হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট ১৯৬৬ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ‘শিক্ষা নীতি’ নামেও দু’টো প্রতিবেদন প্রণীত হয়েছিল- এয়ার মার্শাল এম. নূর খান নেতৃত্বে পাকিস্তানের নতুন শিক্ষানীতি ১৯৬৯ ও শামসুল হক কমিটি প্রণীত শিক্ষানীতি ১৯৭০, উল্লেখ্য, ঘোষিত সব কয়টি প্রতিবেদন/নীতি প্রবল আন্দোলনের মুখ থুবড়ে পড়ে, নিক্ষিপ্ত হয় আস্তাকুড়ে। বর্তমান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ (এমপি)সহ বরণ্য শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতক নেতৃবৃন্দের অনেকে এসব আন্দোলন সংগ্রামে শরিক ছিলেন। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন বিশেষ করে ১৭ সেপ্টেম্বরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এক্ষেত্রে বড় দৃষ্টান্ত।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ -এর পূর্বে স্বাধীন বাংলাদেশে আরো ছয়টি কমিশন/কমিটি রিপোর্ট ঘোষিত হয়েছিল। এগুলো হলো : বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন (ড. কুদরত-ই-খুদা) রিপোর্ট ১৯৭৪, অন্তবর্তীকালীন শিক্ষানীতি (কাজী জাফর-আবদুল বাতেন প্রণীত) ১৯৭৯, মজিদখান কমিশন রিপোর্ট ১৯৮৩, মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ১৯৮৭, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ ও জাতীয় শিক্ষা কমিশন (মনিরুজ্জামান মিয়া) প্রতিবেদন ২০০৩, জাতির দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যেমনি সাংবিধানের চার মূলনীতির উদ্ভব ঘটেছিল তেমনি স্বধীনতাউত্তর বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠিত কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টেও জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র হিসেবে প্রণীত সুপারিশেও জাতির প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক স্বৈরাচারী সরকারসমূহ তা বাস্তবায়ন না করে, সকলেই বিতর্কিত, খন্ডিত কিছু প্রতিবেদন, সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে শিক্ষাঙ্গন ও সুশীল সমাজের বৈধতা পাওয়ার এক ব্যর্থ প্রয়াস হিসেবে। স্পষ্টত: বাংলাদেশে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ হয়েছে দু’টো । দু’টোই হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তথা বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে – ২০০০ ও ২০১০ -এ। এবং ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ -এ মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সংক্রান্ত বক্তব্য, মন্তব্য ও সুপারিশ বহুলমাত্রায় পরিলক্ষিত।
শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক স্তর। আমাদের দেশে এতদিন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষানীতির আলোকে এর সীমা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নির্ধারণ করে প্রাথমিক শিক্ষার ভিতকে আরও মজবুত ও প্রায়োগিক উপযোগিতাপূর্ণ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে প্রতি উপজেলায়/থানায় একটি করে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণী চালু করা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে যার পরিধি ও সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে জানা যায়।
প্রাথমিক শিক্ষাকে অর্থবহ করে তোলার জন্য সরকার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। স্কুলের সংখ্যাবৃদ্ধি, বর্ধিত সংখ্যায় শিক্ষক নিয়োগ, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, স্কুল-টিফিনের ব্যবস্থা, প্রাথমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রবর্তন ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার এই স্তরকে যেমন শক্তিশালী ও টেকসই করার চেষ্টা করা হচ্ছে তেমনি ঝরে পড়ার হারও উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশা করা যায়। চলতিবছরের ডিসেম্বর নাগাদ ৭ হাজার ৪শ’ ৩৪টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালূ করা হবে। ২০১৬ সালের মধ্যে ৩৭ হাজার ৬শ’ ৭২ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে ইতিমধ্যেই দেশের ৩৭০ জন প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে একটি রিসোর্স পুল তৈরি করা হয়েছে। এ রিসোর্স পুলের আওতায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১১-১২ অর্থবছরে ২১০০ জন শিক্ষক এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে আরো প্রায় ৩১০০ জন শিক্ষককে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও এর ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আরো ৭৫০০ জন শিক্ষক ও ১০০ জন কর্মকর্তাকে এ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল শিক্ষককে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরমে পাঠদান শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যা থেকে বেরিয়ে আনছে। ক্লাশের পাঠ ক্লাশেই সেরে নিচ্ছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে সারাদেশে ১ হাজার ৬২৪টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছে। এছাড়াও ২৬ হাজার ৪৭টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৫৯০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ৩শ’ টাকা হারে চিকিৎসা ভাতা ও ৫শ’ টাকা হারে বাড়ি-ভাড়া ভাতা প্রদান এবং ১ হাজার ৬শ’টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার ২৫৪ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ৩শ’ টাকা হারে চিকিৎসা ভাতা এবং ৫শ’ টাকা হারে বাড়ি-ভাড়া ভাতা প্রদান করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী গ্রন্থাগারিকদের এমপিওভুক্তকরণ এবং স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার ভাতার আওতাভুক্ত ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠানে ৪ জন করে শিক্ষককে ১ হাজার টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হবে। এছাড়াও বর্তমান সরকারের আমলে মাধ্যমিক পর্যায়ে ১ হাজার ৯৩৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ এবং সরকারি কলেজে প্রভাষক হয়ে অধ্যাপক পর্যন্ত বিভিন্ন পদে ২ হাজার ৫শ’ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে বলে ।
২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এক হাজার ২শ’ ১৪ জন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করে নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকারের আমলে মেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় প্রায় ৪১ ভাগ এগিয়ে গেছে। ১ জানুয়ারীতে সকল বিদ্যালয়ে ৩০ কোটি বই বিনামুল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বিতরন করা হয়েছে। প্রায় ১৫০ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া এই জাতিকে টেনে এখন এক সফল শিক্ষাক্ষেত্রে পৌছেছে বর্তমান সরকার।

বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটেছে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ, ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ, বছরের প্রথম দিনে পাঠ্য বই বিতরণ, শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের কারণেই এই বিপ্লব ঘটেছে। এসব ঘটনা বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রের ‘জাগরণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।আগে মাধ্যমিকের সব বই কিনতে হতো বাইরের বইয়ের দোকান থেকে। শিশু-কিশোরদের পড়ানো হতো মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস। এসব ইতিহাস এখন সংশোধন করা হয়েছে। বছরের প্রথম দিনের পরিবর্তে ক্লাস শুরু হতো দুই-তিন মাস পর। এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ ছিল না। ফলাফল বের হতো পরীক্ষা শেষ হওয়ার তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পর। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ছিল অবহেলার শিকার। ভর্তি-বাণিজ্য, কোচিং-বাণিজ্য, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির কালো থাবায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল পুরো শিক্ষাব্যবস্থা।

বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ : দেশের ইতিহাসে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে দুঃসাহসিক, যুগান্তকারী ও আশা জাগানিয়া বিশাল সফল কর্মযজ্ঞ হলো বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি প্রাথমিক, এবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি স্তরের সব শিক্ষার্থীর নতুন বই প্রাপ্তি আজ বাস্তবতা। পর পর চার বছর শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম দিনেই সারা দেশে সব ছাত্রছাত্রীর হাতে বই পেঁৗছে দেওয়া বর্তমান সরকারের সফলতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ঝরে পড়া রোধে এটি একটি বড় অধ্যায়। প্রথম ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি ১৯ কোটি বই বিতরণ করা হয়। পরের দুই বছরই তা আরো বেড়ে ২৩ কোটিতে পেঁৗছায়। আর ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রায় ২৭ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশে এত বই ছাপানোর কোনো রেকর্ড নেই। বছরের প্রথম দিনেই ছাত্রছাত্রীদের হাতে বই তুলে দিতে পারা জাতির কাছে এক নতুন ইতিহাস। বর্তমান সরকারের আগে কখনোই ১ জানুয়ারি ছাত্রছাত্রীদের হাতে বই পেঁৗছানো সম্ভব হয়নি। বরং আগে বই কিনতে মার্চ-এপ্রিল মাস গড়িয়ে যেত। তখন শুধু প্রাথমিকের ৪০ শতাংশ বই নতুন ছাপিয়ে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো; বাকিরা পেত পুরনো বই। এ ছাড়া ই-বুক তৈরি করা হয়েছে। ‘ভিশন-২০২১ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার জন্য এনসিটিবির ওয়েবসাইট (www.nctb.gov.bd) তৈরি করে সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব পাঠ্যপুস্তকের পিডিএফ ভার্সন আপলোড করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব পাঠ্যপুস্তক আকর্ষণীয় ও সহজে ব্যবহারযোগ্য ই-বুকে কনভার্ট করে আপলোড করা হয়েছে www.ebook.gov.bd। এ ছাড়া ১৭ বছর আগে প্রণয়ন করা কারিকুলাম এ বছর পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৩ সালে এসে নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বই দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকের ৩৩, ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণীর ৫১টি এবং নবম-দশম শ্রেণীর ২৭টি বই হয়েছে নতুন কারিকুলামে।

শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়া : বিনা মূল্যে বই দেওয়া এবং অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২০১০ সালের দুই কোটি ৭৬ লাখ ৬২ হাজার ৫২৯ থেকে বেড়ে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তিন কোটি ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার ১৭২ জনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী বেড়েছে।

শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ : একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে হাজারো সমস্যার মধ্যে ৩৭ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক স্কুলকে জাতীয়করণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২০১২ সালে এসে প্রায় ২২ হাজার রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। এর ফলে প্রায় ৮০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ হলো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮০ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরো ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিটি স্কুলে একজন করে মোট ৩৭ হাজার জন দপ্তরি নিয়োগের কাজ চলছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি স্কুলে প্রায় দুই হাজার এবং স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুনভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কারিকুলাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলানো হয়েছে সনাতন ধারার পাঠ ব্যবস্থাপনা। মুখস্থ করে এখন আর পরীক্ষা পাস করা যায় না। প্রায় সব বিষয়ে যুক্ত হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি। এর ফলে পরীক্ষা পাস করতে হলে এখন পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং প্রয়োগ করতে হবে। আর পারলেই নম্বর। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষার ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। আগে কখনো মার্চ-এপ্রিলের আগে নিয়মিত ক্লাস শুরু হতো না। এখন প্রতি বছর মাধ্যমিক স্তরে ১ জানুয়ারি ও কলেজে ১ জুলাই ক্লাস চালু করা সম্ভব হয়েছে। এতে ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণীঘণ্টা বেড়েছে। সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ২০০৯ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা ও ২০১০ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণী শেষে স্কুলে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাদ্রাসায় জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে। এ পরীক্ষার কারণে এখন শিক্ষক-অভিভাবকরা ক্লাসের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর মানোন্নয়নের চেষ্টা করেন। এ ছাড়া প্রতিবছর ১ নভেম্বর জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা শুরু হয়, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু করা হয় ১ এপ্রিল। এসব পরীক্ষার ফলাফল পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে প্রকাশ নিশ্চিত হয়েছে।

শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নও করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে দেশের নির্বাচিত ৩০৬টি মডেল স্কুল স্থাপন (যেসব উপজেলায় সরকারি হাইস্কুল নেই এমন সব উপজেলায়) ও ২৬৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য জেলা সদরে অবস্থিত পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এ উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের অধীনে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে মোট ৭১টি কলেজের নির্মাণকাজ হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরুর আগে শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুর আগ্রহ সৃষ্টির জন্য এক বছরমেয়াদি চালু করা হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। ৫+ বছর বয়সী শিশুরা ভর্তি হবে।

এখন বিবেচণা আপনার। আপনি কী চান, শিক্ষিত জাতি? আপনার সন্তান শিক্ষিত সাবলম্বী হয়ে বিশ্ব দরবারে সমহিমায় শির উচুঁ করে দাড়াক, না অনেধ ও বধিরের মতো আমৃত্ত্যু পরের গোলামী করুক?

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/ahussainmintu/22743.html



মন্তব্য করুন