এ হুসাইন মিন্টু-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

হাসিনার ভুল/জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে সভানেত্রী ও তৃণমূলের চাহিদার অমিল

লিখেছেন: এ হুসাইন মিন্টু

শুরু করছি আমাদের প্রিয় সঙ্গীত শিল্পী ও ব্লগার প্রীতম আহমেদে-এর একটি কথা দিয়ে। আমার যদি শোনার ভুল না হয়ে থাকে তাহলে কোনো একটি টিভি টকশো-তে কথা প্রসঙ্গে প্রীতম ভাই এক রাজনৈতিক নেতাকে বলে ছিলেন, আমি একজন সঙ্গীত শিল্পী। আপনার মতো দুই একজন রাজনৈতিক নেতাকে দুই চার বেলা খাওয়ানোর সামর্থ আমার আছে। কিন্তু আমার মতো প্রীতমকে এমপি মন্ত্রী বানানোর সামর্থ বা ক্ষমতা কোনোটাই আপনার নেই।

এই কথাটি এত ভালো লেগেছিল যে আজও ভুলতে পারি নি। প্রীতম ভাইয়ের এই কথাটির আমি একটা মানেই খোঁজে পেয়েছি আর তা হল, সব কথার ভেতরে রাজনৈতিক গন্ধ খোঁজা যেমন অনুচিত, ঠিক তেমনি সবকিছু দলীয় দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখা সমুচীন নয়। অর্থাত আমরা সবাই, সবার আগে বিবেক বুদ্ধি সম্পূর্ণ মানুষ। সবার আগে নিজের বিবেক বিবেচেণা দিয়ে ভালো মন্দ যাচাঁই করা উচিত।
কথাটা এই জন্য বললাম, আমি আজ যে লেখাটি লেখছি এটি সম্পূর্ণরূপে আওয়ালীগের সমালোচনায় ভরপুর। তাই এই লেখা পড়ে কেউ আবার যেন আমাকে লীগ বিরোধী ভেবে না বসেন, আর ভাবলেও কিছু করার নেই। আমার দৃষ্টিতে যা খারাপ লাগে তা আমি বলবোই। আমি মনে করি আওয়ামীলীগকে মন থেকে ভালোবাসি বলে, এই দলের ভালো মন্দ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করার অধিকার আমার আছে। তাতে কে খুশি বা বেজার, তা দেখার সময় বা মাথা ব্যথা কোনোটাই আমার নেই। কারণ দল থেকে কোনদিন কোনো স্বার্থ আমি কখনো নেই নি, এবং ভবিষ্যতেও এ রকম কোনো আশা প্রত্যাশা নেই।

এবার চলুন মূল প্রসঙ্গে আসি। পত্রিকার খবর, <b>এলাকায় জনসংযোগ চালাতে গিয়ে সরকার দলীয় সাংসদ তৃণমূল অর্থাত জনতার ধাওয়া খেয়েছেন।</b> এই খবর পড়ার পর যেমন একদিকে কষ্ট পেয়েছি, আবার মোটামোটি খুশিও হয়েছি। আপনি এখন প্রশ্ন করতে পারেন, একই খবর আপনাকে আনন্দ বেদনা দুটোই দেয় কেন ?
এই কেন-র উত্তর হল, প্রথমে বেদনার কথাটা বলছি, আওয়ামীলীগের মতো এমন একটি ঐতিহ্যবাহী দলের একজন নির্বাচিত সাংসদ তার নিজ দলের নেতাকর্মীর দ্বারা ধাওয়া খাবে এটা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না !
দ্বিতীয়তে আনন্দের কথা, একজন তৃণমূল কর্মী তার নেতার উপর কতটুকু বিরক্ত হলে এ রকম জঘন্য আচরণ করতে বাধ্য হয়, তা আমি খুব ভালো করে জানি বা অভিজ্ঞতা আছে বলেই অন্তরে সুখের পরশ লেগেছে।

আপনি শিল্পপতি, বড় বিজনেসম্যান, সাবেক আমলা, আওয়ামীলীগের অমুক তমুক, সারা জীবন থেকেছেন ঢাকায়। হঠাত নির্বাচনের আগে দলীয় টিকেট কিনে এলাকায় এমপি নির্বাচন করতে চলে এসেছেন! প্রথমে আপনাকে দেখে এলাকার নেতা কর্মীরা স্তম্ভিত ও হতাশ। এত হতাশার পরও একমাত্র দলের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে রাত দিন পরিশ্রম করে ঘাম জড়িয়ে আপনার নির্বাচন করে আপনাকে জয়যুক্ত করেছে। আর নির্বাচিত হওয়ার পর আপনি হয়ে গেলেন বঙ্গের লাট। সেই যে ঢাকায় এসেছেন আর গ্রামে(এলাকায়) যাওয়ার নাম নেই। যদি আপদে বিপদে পড়ে এলাকার কোনো নেতাকর্মী আপনার কাছে আসে, প্রথমে কমপক্ষে তিনদিন অপেক্ষা করতে হয় আপনার সাক্ষাত পেতে। সাক্ষাত পাওয়ার পর তার সাথে আপনার ব্যবহার থাকে চাকর আর মনিবের মতো ! নির্বাচনে জিতার পর অনায়েসে ভুলে যান আপনি যতো বড় সম্রাট-ই বণে যান না কেন, পাঁচ বছর পর আপনাকে এই তৃণমূলের কাছেই আসতে হবে। নিজেকে রাজা ভেবে যে তর্জনী তুলে এলাকার নেতা কর্মীর সাথে প্রজার মতো আচরণ করেছেন, পাঁচ বছর পর সুবর্ণসুযোগ পেয়ে সেই তর্জনী যে এইসব নেতা কর্মীরা ভেঙ্গে দেয় না, এটাই আপনার সুভাগ্য। বাংলাদেশে এ রকম আরো অনেক সাংসদ আছেন যারা ভবিষ্যতে নিজ এলাকায় গেলে পাবলিকের ধাওয়া খাবে বলে আমার ধারনা।

এবার আসুন আমার এলাকার একটা ঘটনা বলি, তাহলে ব্যাপারটা আরো সহজে বুঝতে পারবেন এবং হাসিনার নির্বাচনী প্রার্থী সেলেকশনের ভুলটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমার নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহ-৬, প্রায় দুইলক্ষাধিক ভোটার এই এলাকায়। ১৯৯৬ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামীলীগের হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধীতা করে এডভোকেট মোসলেমদ্দিন জয় লাভ করে ছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ এলাকায় উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উন্নয়নমূলক কাজই তিনি করে নি ! ফুলবাড়ীয়া থেকে গুপ্তবৃন্ধাবন(যা তামালতলা নামে খ্যাত) পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার রাস্তাটি অত্র এলাকার দ্বিতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। অর্থাত এনায়েতপুর, ভবানীপুর ও কালাহদ ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ বাসিন্দার যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত এই এলাকার মানুষের দাবী আবদার প্রত্যাশা বলতে ছিল একটাই, এমপি মোসলেমুদ্দিন অন্তত এই রাস্তাটি পাকা করে দিবেন। কিন্তু তিনি পাঁচ বছরে রাস্তায় একটি ইটও ফেলেন নি, পাকা করা তো দূরের কথা!

২০১১ সাল। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার মতো নির্বাচনী তোর জোর চলছে এখানেও। আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এলাকার সবাইকে হতাশ করে প্রার্থী হিসেবে সেই মোসলেমুদ্দিনকেই মনোনয়ন দিলেন ! ক্ষোভে ফেঁটে পড়ল এলাকার সাধারণ নেতাকর্মী। কারণ মোসলেমের হয়ে যার কাছে ভোট চাইতে যায়, সে-ই মুখের উপর বলে দেয়, তোমাদের মোসলেম চোরা( মোসলেম সাহেব পেশায় উকিল হলেও এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে চোর বলেই খ্যাত) গত পাঁচ বছরে কী করেছে, তাকে আবার ভোট দেবো কেন ? নেতা কর্মীরা জবাব না দিতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে ফেরত চলে আসে! একরাতে জনসংযোগ চালাতে মোসলেম সাহেব আসবেন এনায়েতপুর ইউনিয়নে। আমাদের দেশের বড় বড় নেতাদের আশপাশে চামচীকাদের যেমন অভাব থাকে না, মোসলেমুদ্দিনও তার ব্যতিক্রম নয়। শুভেচ্ছাধ্বনি, জয়ধ্বনি পাওয়ার আশায় সেই চামচীকাদের কোনো একজন সোয়াইতপুর বাজারে (এই বাজারটি এনায়েপুর ইউনিয়েনর সবচেয়ে বড় বাজার) আগেই খবর পাঠিয়ে দিয়েছেন আজ মোসলেম সাহেব আসবেন। মোসলেম সাহেবের আগমনী বার্তা শোনে গুপ্তবৃদ্ধাবনের মানুষ বেড়িকেট দিয়ে রাস্তা ব্লক করে দিলো ! বৃষ্টির দিন, কাঁদামাখা কাঁচা রাস্তা দিয়ে মোসলেম সাহেবের বিলাসবহুল গাড়ী আসতে পারবে না বলে মোসলেম সাহেব ফুলবাড়ীয়া থেকে প্রথমে ময়মনসিংহ, পরে ময়মনসিংহ থেকে ভরাডোবা, অবশেষে ভরাডোবা থেকে গুপ্তবৃন্ধাবন গিয়ে পৌছলেন, অর্থাত নিজের নির্বাচনী এলাকা দিয়ে আসলে যেখানে ২৫ কিলোমিটার গাড়ী চালালেই পৌছা যেত, সেখানে তিনি ২০+৪০+২০=৮০ কিঃমিঃ ঘুরে গুপ্তবৃন্ধাবন এসে পৌছলেন! এই গুপ্তবৃন্ধাবন হল ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার শেষ সীমানা। অর্থাত রাস্তারপশ্চিমপাশে ময়মনসিংহ আর পূর্বপাশে টাঙ্গাইল।

গুপ্তবৃন্ধাবনে রাস্তার উপর এত লোকজনের সমাবেত দেখে মোসলেম সাহেব পুলকিত হয়ে সদম্ভে গাড়ী থেকে নেমে এলেন। গাড়ী থেকে নামার পর এলাকার উপস্থিত লোকজন তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলো, এটা তার নির্বাচনী এলাকা না, এখান দিয়ে তিনি গাড়ী নিয়ে যেতে পারবেন না ! আবার অনেকেই সজোরে বলল, নির্বাচনের সময় গাড়ী নিয়ে আসতে হবে, এটা গত পাঁচ বছরে একবারো মনে পড়ে নি, তাহলে রাস্তা পাকা করেন নি কেন ? আজকে অন্যের রাস্তা দিয়ে যেতে এত মজা লাগছে কেন ? আরো অনেক রকমের কথাবার্তা(এই রাস্তাটি ৯৩/৯৪ এর দিকে বিএনপি-র মন্ত্রী লুত্ফুর রহমান আজাদ পাকা করে দিয়ে ছিলেন) মোসলেম সাহেব মুখ ভোতা করে ফেরত চলে গেলেন ! এরপর নিজ এলাকায় যেখানেই তিনি নির্বাচনী প্রচার বা জনসংযোগের জন্য নামতে চেয়েছেন, সেখানেই বাঁধাপ্রাপ্ত হয়েছেন! নিজ দলীয় নেতাকর্মীরাই বলেছে, আপনার চেহেরা দেখলে এলাকায় ভোট কমে যাবে। আপনি চলে যান। আওয়ামীলীগের ভোট যা আছে তা এমনিতেই নৌকায় পড়বে, আপনাকে কষ্ট করে এলাকায় আসতে হবে না!

এতকিছুর পরও মোসলেম সাহেব বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে ৪৫০০ মতো কম ভোট পেয়ে ২০০১ এর নির্বাচনে এখানে পরাজিত হয়ে ছিলেন! এখন বলুন, হাসিনা যদি এখানে মোসলেমের পরিবর্তে অন্য কাউকে দলীয় মনোনয়ন দিতেন, তাহলে সে নির্বাচনে পাশ করতো কি না ? শুধু মাত্র প্রার্থী নির্বাচনের ভুলের জন্যে ২০০১ -এ আওয়ামীলীগ এই আসনটি হারিয়ে ছিল! শুধু ফুলবাড়ীয়া বা ময়মনসিংহেই নয়, এমন ঘটনা বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই ঘটেছে! শুধু মাত্র ভুল প্রার্থী সিলেকশেনের কারণে বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ অনেক আসন হারিয়েছে। এবারো তার সম্ভাবনা আছে, যদি প্রার্থী সিলেকশনে হাসিনা ভুল করেন, তাহলে অনেক আসন হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে হাসিনার উচিত প্রার্থী সিলেকশনে মৃণমূলের মতামতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া এবং চামচীকাদের কথা না শোনা।

(ফুলবাড়ীয়ায় ২০০৮এর নির্বাচনে আওযামীলীগের হয়ে মোসলেমুদ্দিন আবারো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন এবং এবারো তিনি এলাকায় উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করেন নি ! একে ভবিষ্যতে মনোনয়ন দোওয়া হলে, আগামীতে এই আসনটি আওয়ামীলীগের ফের হারানোর সম্ভাবনা আছে!)

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/ahussainmintu/22674.html



মন্তব্য করুন