আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

সাধারণ ক্ষমা এবং ৭৩ এর ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা

লিখেছেন: আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল

সাধারণ ক্ষমা ও ৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অনেকের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ অপপ্রচার।

বঙ্গবন্ধু কি সকলকে ক্ষমা করেছিলেন:

হযরত মুহাম্মদ(স) যখন ১০২৪ (প্রায়) জন নিয়ে মক্কা বিজয় করেন তিনি ক্ষমা করে উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন এটি যেমন সত্যি তেমনি এটিও সত্যি যে বীর হামজা(রা:)’র কলিজা ভক্ষণকারী হিন্দার শিরোচ্ছেদ করা হয়েছিল।

যে কোন দেশে যুদ্ধ পরবর্তী অস্থির অবস্থায় সাধারণ ক্ষমা একজন রাষ্ট্রনায়কের উদারতার পরিচয়ই বহন করেনা একই সাথে তার নেতৃত্বের পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক। বাংলাদেশের একটি শ্রেণী পাকিস্তানের প্রতি নীতিগত সমর্থন পোষণ করতো অথবা তাদের মতাদর্শের অনুসারী ছিল অথচ কোন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না।
আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করতে রাজনৈতিক রঙ দেয়ার চেষ্টা করার সম্ভাবনাও থাকে। গৃহযুদ্ধের দৃষ্টান্তও ইতিহাসে রয়েছে। আমরা এক সময় কাদের সিদ্দিকী কর্তৃক এক রাজাকারকে প্রহার করার পোষ্টার রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটি দেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট ছিল তবু এ সাধারণ ক্ষমা দ্রুততম সময়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছিল। তাই মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে এবং এত দ্রুততম সময়ে মিত্রবাহিনীর ফিরে যাবার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।

কিন্তু এই সাধারণ ক্ষমায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল যারা হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল তারা সাধারণ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত নয়।
বঙ্গবন্ধু দিল্লির স্টেটসম্যান পত্রিকায় কুলদীপ নায়ারের নেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তাদের ক্ষমা করলে ভবিষ্যত বংশধর এবং বিশ্বসমাজ আমাকে ক্ষমা করবে না”।

১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী

আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিরা বিচারের আওতায় আসার কথা। তাদের মুক্তি দেয়া হল কেন? কিছু বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন
যুদ্ধাপরাধের বিচার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরে হয়ে থাকে। জার্মানি মিত্র বাহিনীর সাথে জার্মান যুদ্ধবন্দিদের বিচারের অঙ্গীকার করেছিল কিন্তু সরকারের সদিচ্ছার কারণে তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। যেমনটি করেনি পাকিস্তান এবং ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের শাসকরা।

  • ৭০ এর নির্বাচনের পর থেকে বিশেষত ৭১ সালের জানুয়ারি থেকে সেনাবাহিনীর বাঙালী সদস্যদের পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো শুরু করে। স্বাধীনতার পর বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারী পাকিস্তানে ছিল। তাদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
  • ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ত্রিদেশীয় চুক্তিতে ১৫ নং ধারায় বলা হয়, “যেহেতু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করেছিল সে প্রেক্ষিতে তাদের ক্ষমা করা হয়”।

এ প্রেক্ষিতে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড: কামাল হোসেন বলেন,

পাকিস্তান সরকার তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিধায় তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

তাই পাকিস্তানী ও এদেশীয় দালালদের বিচার এক করে দেখার উপায় নেই। উল্লেখ্য যুদ্ধ-ফেরত ১৯৫ জনের সকলেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে চাকরীচ্যুত হয়েছিল।

  • ৭৫ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য চলছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক গেজেট নোটিফিকেশনের(No. 871-Pub)THE BANGLADESH COLLABORATORS (SPECIAL TRIBUNALS) (REPEAL) ORDINANCE, 1975 Ordinance No. LXIII of 1975 এর মাধ্যমে এ বিচারকার্য স্থগিত করে।
  • সিমলা চুক্তি নিয়ে একটি অপপ্রচার করা হয় অথচ সিমলা চুক্তিতে যুদ্ধাপরাধ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়েরই উল্লেখ নেই।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার তিন মাস পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অগণতান্ত্রিকভাবে রহিত করা হয়

THE BANGLADESH COLLABORATORS (SPECIAL TRIBUNALS) (REPEAL)

যুদ্ধাপরাধের বিচার কখনও তামাদি হয়না

বিশ্বের অনেক দেশেই ৪০/৫০ বছর পর মানবতা-বিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্ত আছে, এখনও বিচার চলছে। ২০০৮ সালে কম্বোডিয়ায় যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয় তখন প্রশ্ন করা হয়েছিল ৩০ বছর পর কি বিচারের প্রয়োজন আছে? তখন কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছিল,

“অবশ্যই এ বিচার জরুরী। এ বিচারের মাধ্যমে আমরা শুধুমাত্র দায়মুক্তই হবোনা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হবে”।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌশলী জ্যাকসনের একটি মন্তব্য আইনশাস্ত্রে প্রবাদ স্বরূপ,

যুদ্ধাপরাধের বিচার কখনও তামাদি হয়না।

৭১ এর মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের দাবীতে নির্মূল কমিটি সহ প্রগতিশীল সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করে আসছে। যুদ্নিধাপরাধের বিচারে নির্মুল কমিটির অবদান অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তারা ৭১ টি সংগঠনকে একত্রিত করে এবং তারা সংহতি প্রকাশ করে। জনমত গঠন ও বিশ্ব-বিবেককে জাগ্রত করা ছাড়াও তাদের কর্মকাণ্ড এবং তাদের উদ্যোগে প্রকাশিত তথ্য, প্রমাণ, দলিল এ বিচারকার্যকে অনেক সহজতর করেছে কারণ এসব প্রামাণ্য সংগ্রহের দায়িত্ব ট্রাইবুনাল এবং সংশ্লিষ্ট তন্তকারীদের করতে হত।

২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয় এদেশের জনগণ এর পক্ষে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মত ব্যাপকভাবে সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে। এ বিচার সম্পন্নের জন্য ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ সংসদে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব পাশ হয় এবং ২৫ মার্চ ২০১০ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/ahj/73.html

 1 টি মন্তব্য

  1. lambardpolash

    i am not dare to take part against you and so must agree !Keep it up. The way ,you described this sophisticated issue,is great ,i mean ,i liked it. We will be waiting for something new….!!!

মন্তব্য করুন