A LIBRARY OF RURAL DEVELOPMENT-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

অন্য ভাবনার অন্তরালে গ্রামীন শিক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন পিছিয়েই পড়ছে ।

লিখেছেন: A LIBRARY OF RURAL DEVELOPMENT

আমরা নারী নির্যাতন বন্ধের কথা ভাবছি, ঢাকার উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছি, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় বার বারই ব্যক্ত করছি । কিন্তু সামগ্রিক এই চিন্তাগুলোর সফলতার মূল অস্ত্র যে শিক্ষা সেই শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা এখনও আসছে না । বিশেষ করে শহরাঞ্চল ব্যতিত গ্রামীন শিক্ষা ব্যবস্থা খুঁড়িয়ে চলার চেয়েও করুন অবস্থায় আগাচ্ছে ।নানা কারনে গ্রামীন শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও হুমকির মুখে । জীবন জীবিকা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, অজ্ঞতা সবকিছুর যাতাকলে পৃষ্ঠ হয়ে এখনও শিক্ষকে বড় ঘরের সম্পদ হিসাবেই বিবেচনা করা হয় আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলোতে । শুধু তাই নয় শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, শিক্ষার অবমূল্যায়ন, মেয়ে শিক্ষায় অনগ্রসরতা গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দিন দিনই ধ্বংশের প্রান্তে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে । প্রথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক । ভাবতেই কষ্ট হয় এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পার হওয়ার আগেই আমাদের দেশের ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে যায় । শুধু এবারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জে.এস.সি, জেডিসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা ছিলো প্রায় ৬০,০০০ এর উপরে ।যারা পরীক্ষা দিয়েছে তাদের মধ্য থেকেও অকৃতকার্য হবে এবং খারাপ ফলাফলও করবে । এদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যেই পড়তে যাচ্ছে । একদিকে খারাপ ফলাফল অন্যদিকে শিক্ষিত হয়ে বসে থাকার প্রতিচ্ছবি গ্রামীন সমাজে শিক্ষাকে অনুৎসাহিত করার প্রধান নিয়ামক । যেভাবে দিন দিন বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে সেভাবে আমাদের শিক্ষাকে আধুনিকায়নতো দূরে থাক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও মানুষের কাছে উপলুব্ধ বিষয় হিসাবে প্রকাশ করা যায়নি ।শহরাঞ্চলে শিক্ষার আধুনিকায়ন বা মান বাড়ানোর দিকে কিছুটা দৃষ্টি দিলেও গ্রামাঞ্চল এখনও আদিম যুগের মতই শিক্ষাকে একটি ভার হিসাবে শিশুদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় । এদের ভাবানোই হয় শিক্ষা শুধুই মুখস্থের আর পাশের জন্য । এর সঠিক উপলব্ধি বা কার্যাবলী শেখানোর কোন মাধ্যম এখনও পিছিয়ে পড়া সমাজগুলোতে পরিলক্ষিত নয় ।
আমরা কিন্তু বার বারই বলছি শিক্ষা ছাড়া কোন উপায় নেই উন্নয়নের ক্ষেত্রে । কিন্তু শিক্ষাকে বিস্তৃত করার জন্য যে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা কিছুটা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই আগের মতই । যেসব কারনে শিক্ষার দূরাবস্থা তা কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি । আশা করি কতৃপক্ষ এ বিষয়ে নজর দারি বাড়িয়ে আমাদের দেশকে একটি শিক্ষায় স্বনির্ভর বাংলাদেশে পরিনত করতে সহায়তা করবে ।
অর্থনৈতিক অনুন্নয়ন : দারিদ্রসীমার বসবাসকারী জনগনের সংখ্যা এখনও বাংলাদেশে আশংখ্যা জনক । শিক্ষাকে যদি দ্বিতীয় মৌলিক অধিকার ধরা হয় তবে প্রথম মৌলিক অধিকার অন্নের ণিশ্চয়তা জরুরী । কারন যদি খাদ্যের অপিরিপূর্নতা থাকে তবে শিক্ষার দিকে জনসাধারনকে ঝোকানো কঠিন হবেই । যদিও খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কার্যক্রম জনপ্রিয়তা পেলেও ঐ দুর্নীতির চরম আখরা এই প্রকল্পকেও বানচাল করেছে । এরপর বৃত্তির ব্যবস্থাতেও প্রচুর দুর্নীতি । এমনও শোনা যায় কিছু কিছু শিক্ষক বানানো ছাত্রের নাম দিয়ে উপবৃত্তির টাকা তুলে নিয়ে গেছে । যদি এভাবেই শিক্ষা কার্যক্রমে বরাদ্দ টাকা লোপাট হয় তবে শিক্ষা কার্যক্রমে এই দূরাবস্থা কাটানো আদৌ সম্ভব কিনা তা ভাববার বিষয় ।শুধু তাই নয় মেয়েদের কাছ থেকেও পরীক্ষার ফিস, অণ্যান্য খরচ বাবদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা এখনও নেওয়া হয় ।
যার বাড়িতে একবেলা খাওয়ার জন্য তিনদিন সংগ্রাম করতে হয় তার বাড়িতে একটা মেয়ে বা ছেলে থাকলে সে কিভাবে শিক্ষার জন্য অগ্রসর হবে । সে মেয়েকে দেবে বাল্য বিবাহ আর ছেলেকে পাঠাবে শিশু শ্রমের মত ভয়াবহ কাজে ।

বিদ্যালয় সংকট : প্রাথমিক বিদ্যালয় বেশীর ভাগ জায়গায় পর্যাপ্ত পরিমান থাকলেও এখনও মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক কম । আর প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা শেষ করে অনেক ইচ্ছা থাকলেও বেশীর ভাগ ছেলেমেয়েদের পক্ষে সম্ভব হয় না দূরে গিয়ে পড়াশোনা চালানো । এক্ষেত্রেও মেয়েরা ভুক্তভোগী বেশী হয় । কখনও কখনও ধর্মীয় গোরামী, ইভটিজিং এর ভয় অথবা বিদ্যালয়ের দূরুত্বের কারনে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয় ।
যদিও কোন কোন জায়গায় বেসরকারিভাবে মধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয় তার বেশীর ভাগ বিদ্যালয় গুলোতে পড়াশোনার খরচ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ।

শিক্ষক সংকট: এক্ষেত্রেও গ্রামের ছেলেমেয়েরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় । দেখা গেছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় একজন শিক্ষক দ্বারাও পরিচালিত হয় ।অথবা জেলা কোটা থাকা পদ্ধতির কারনে এস. এস সি পাশ অনেক শিক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হয় (যদিও মেয়েদের কর্ম সংস্থানের কথা চিন্তা করে এটা করা হয়েছিলো )। যার কারনে মান সম্পন্ন শিক্ষা প্রাপ্তি থেকে গ্রামের শিক্ষার্থীরা অনেক পিছনে থেকে যায় । এমনও স্কুল রয়েছে যে স্কুলগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশী শিক্ষক থাকলেও অনেক স্কুলেই শিক্ষক স্বল্পতা শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনও বড় অন্তরায় ।

শিক্ষার নিম্ন মান : এখনও আমাদের দেশে এমন বিদ্যালয় রয়েছে যে বিদ্যালয়গুলিতে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ধারনা দেওয়ার মত কোন শিক্ষক নেই বা তথ্য প্রযুক্তির নিয়ামক কম্পিউটার নামক কোন যন্ত্র ছাত্রছাত্রী কোনদিন দেখেনি । ইংরেজী ক্লাস নেয় বাংলার শিক্ষক । যদিও NCTB কতৃক বলা হয় ইংরেজীকে Communicative হিসাবে ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে । কিন্তু অনেক ইংরেজী শিক্ষকও জানেনা এই Communicative বলতে NCTB কি বোঝাতে চেয়েছে । বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় কোনভাবেই করানো যাচ্ছে না । কারন রিডিং পড়ে বিজ্ঞানকে মুখস্থ করার যে সূত্র টিচাররা ক্লাসে দিয়ে যান তা শুধু হতাশা ব্যঞ্জকই নয় হাস্যকরও ।
এর পর গণিত যদি সৃজনশীল করা হয় তবে শিক্ষরা কি তালগোল যে পাকান তা দেখা গেছে ২০১০ সালে যখন হঠাৎ সব বিষয় সৃজনশীল করা হবে এমন ঘোষনা দেওয়ার পর । যাই হোক শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখনও অনেক নীচে রয়ে গেছে । যার কারনে শহরাঞ্চলের শিক্ষাথীর্দের সাথে প্রতিযোগীতায় এরা সবসময়ই পিছনে থেকে যাচ্ছে ।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা :এই অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম আমাদের দেশের একটি চির চেনা রুপ হয়ে দাঁড়িয়েছে । এই কিছুদিন আগে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী বিষয়ে একটি তথ্য আনতে গিয়ে এখানকারই এক সাংবাদিক দেখলেন পনের দিন ধরে ঐ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন রোল কল করা হয় নি । আমাদেরই গ্রামের এক মাদ্রাসায় ফরম ফিলাপ বাবদ এবারও নেওয়া হয়েছে সাড়ে চার হাজার টাকা করে । জানতে চাওয়া হলে বলা হচ্ছে কোচিং ফি সহ নেওয়া হচ্ছে ।
অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দুটার পর কোন ক্লাস নেওয়া হয় না । টিও বা এটিও এলে তাদের টাকা দিয়ে দেওয়া হয় । এক্ষেত্রে দু-পক্ষ লাভবান হলেও যারা দেশের ভবিষ্যৎ কোমলমতি শিশুরা ঠিকই তাদের দিক হারিয়ে ফেলছে । এছাড়াও নকল বানিজ্য, টাকা নিয়ে পরীক্ষার হলে নিজের প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা, পাশ করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি অনিয়মতো আছেই ।

উপরে উল্লেখিত কারন ছাড়াও অনেক কারন রয়েছে যার কারনে শিক্ষা গ্রহন এবং শিক্ষাকে জনপ্রিয় করার লক্ষ গ্রামাঞ্চলে এখনও দূরহ । আমরা জাতিকে গঠন করতে চাইলে এই শিক্ষাকে সবার আগে প্রসারিত করতে হবে । সবাইকে বোঝাতে হবে শুধু চাকুরির জন্যই শিক্ষা নয় । শিক্ষা হলো নিজেকে জানার এবং নিজের সম্পর্কে অন্যকে জানানোর মধ্যম । আমি ধান চাষ করি, অথবা ভ্যান চালাই তাতে কিছু আসে যায় না শিক্ষা আমাকে নিতেই হবে- এই মন্ত্র সকলের মনে ঢুকিয়ে দিতেই হবে ।
শিক্ষার উন্নয়নে কয়েকটি পদক্ষেপ সরকারকে এখনই নিতে হবে ।
-নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে যাতে করে নারীদের এইচ. এস.সি পাশের পর বিয়ে দেওয়া যায় এজন্য আইনকে কঠোর করা । এবং পড়াকালীন সময়ে প্রয়োজনে সরকারিভাবে নারী শিক্ষার জন্য কর্মসংস্থান করে দেওয়া ।
-সব বিদ্যালয়ে তদারকি সঠিকভাবে করে পড়ার সঠিক পরিবেশ তৈরী করা ।
-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ বাড়ানোর জন্য প্রতি মাসে মেধা প্রতিযোগীতা মূলক কোন অনুষান অন্তত একবার করে হলেও পরিচালনা করা এবং প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহন বাধ্যতামূলক করা ।
-শিক্ষকদের উন্নত মানের করে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা । বেসরকারি স্কুলেও প্রয়োজনে ভালো শিক্ষক ট্রান্সফার করে অন্য স্কুল থেকে নিয়ে আসা ।
-সকল ধরনের অনিয়ম বন্ধে এখন থেকেই কাজ করা ।
-ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি বিজ্ঞান চর্চা, কাজের চর্চা বৃদ্ধির জন্য নানামূখী ব্যবস্থা গ্রহন করা ।
-প্রতি সপ্তাহে একদিন নৈতিক শিক্ষার একটি ক্লাস বাধ্যতামূলক করা ।
-শিক্ষক সংকট কমিয়ে আনা ।
-শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করা ।
-স্কুলের শিক্ষক দিয়ে কোচিং করানোর নামে বানিজ্য বন্ধ করা ।
শিক্ষার আধুনিকায়ন যে কোন মূল্যে গ্রামীন পর্যায়ে পৌছে দিতেই হবে ।যদি এখানে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, শিক্ষাকে জনপ্রিয়তা বাড়ানো বা শিক্ষার আধুনিকায়ন না করা যায় তবে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয় । আমাদের ভাবনায়ই ফেলে দেয় গ্রাম আর শহর শিক্ষার দূরুত্ব । বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এই ভাবনার সমাধোনেই বেড়িয়ে আসতে পারে আমাদের জাতির আগামী দিনের আলোকময় একটি ভবিষ্যৎ ।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/a-library-of-rural-development/24128.html



মন্তব্য করুন